fbpx
garo wangala dancegaro wangala danceWanna folk Dance

গারো বর্ণমালা (থকবিরিমের) আত্নকথার ইতিবৃত্ত

অনেক অনেক বছর আগে গারো জাতিরা ম্যান্ডেলায় নামক একটি দেশে বাস করত। যা বর্তমানে মায়ানমারে অবস্থিত একটি শহরের নাম। অনেক গারো পন্ডিতগণ ধারণা করেন যে ম্যান্ডেলায় থেকেই মান্দে বা মান্দি শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। সেখানে দিগন্ত সুবিস্তৃত গ্রামগুলিতে তাঁরা বেশ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করত। তাঁরা নিজেদের জন্য বিশাল সুউচ্চ ঘর নির্মাণ করে এবং তাদের পূজনীয় দেব-দেবীদের জন্য বড় বড় মন্দির নির্মাণ করে। সেই সময় গারোদের পশুর চামড়ার উপর খচিত নিজস্ব লিখিত লিপি ছিল। সে সময় গারোদের খন্ডখন্ড রাজ্যে বিভক্ত ছিল। রাজ্যগুলো অনেক ধন-সম্পদেপূর্ণ ও সমৃদ্ধশালী ছিল। জাতি হিসাবে তাঁরা সে সময় সভ্য এবং সংস্কৃতিমনা ছিল।

গারো বর্ণমালা (থকবিরিমের) আত্নকথার ইতিবৃত্ত

Ruel C. Sangma

হাজার বছর আগে গারো জাতিগোষ্ঠী ম্যান্ডেলায় নামক একটি দেশে বাস করত। যা বর্তমানে মায়ানমারে অবস্থিত একটি শহরের নাম। অনেক গারো পন্ডিতগণ ধারণা করেন যে ম্যান্ডেলায় থেকেই মান্দে বা মান্দি শব্দের উৎপত্তি হতে পারে। সেখানে দিগন্ত সুবিস্তৃত গ্রামগুলিতে তাঁরা বেশ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করত। তাঁরা নিজেদের জন্য বিশাল সুউচ্চ ঘর নির্মাণ করে এবং তাদের পূজনীয় দেব-দেবীদের জন্য বড় বড় মন্দির নির্মাণ করে। সেই সময় গারোদের পশুর চামড়ার উপর খচিত নিজস্ব লিখিত লিপি বা বর্ণমালা ছিল। সে সময় গারো শাসিত খন্ডখন্ড রাজ্যে বিভক্ত ছিল। তাঁরা তাদের নিজস্ব রাজ্যগুলোর রাজাদের বা নকমার অধীনে একসাথে বসবাস করত। রাজ্যগুলো অনেক ধন-সম্পদপূর্ণ ও সমৃদ্ধশালী ছিল। জাতি হিসাবে তাঁরা সে সময় সভ্য এবং সংস্কৃতিমনা ছিল। নিজেদের তৈরি মিল্লাম (তলোয়ার), বর্শা, ঢাল, তীর-ধনু এবং চন্দল ​​(মিলিত) ব্যবহার করত। এছাড়াও তাঁরা অনেক কিছুর ব্যবহার সম্পর্কে জানত । কিভাবে খনি থেকে মূল্যবান ধাতু খনন করতে হয় এবং তা পরিশোধন করে কিভাবে লোহা ও ইস্পাতের সরঞ্জাম তৈরি করতে হয়। সেই সময় তাঁরা নিজেদের উদ্ভাবিত তাঁত দিয়ে কিভাবে সূক্ষ্ম এবং নিপুনভাবে বস্ত্র বুনন করতে হয় তার কলা-কৌশলও জানত। তাঁরা মানোবিজ্ঞানের নিগূঢ়তত্ত্ব এবং বিশেষত্বের কথা জানত, যা তাঁরা পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শিখেছিল । কিন্তু ইতিহাসের একটি চরম খারাপ মুহুর্তের কারণে তারা আজ তাদের অতীত বর্ণমালা, ইতিহাস ভুলে গিয়েছে।

কোন এক বছর ম্যান্ডেলায় এর উত্তরাঞ্চল থেকে বন্য মানুষদের একটি বিশাল দস্যুদল হঠাৎ গারোদের আক্রমণ করে বসে। যদিও পরে তাঁরা কঠোরভাবে আক্রমণ প্রতিরোধ করে কিন্তু দস্যুদের বিশাল বাহিনীর দ্বারা অবশেষে তাঁরা করুণভাবে পরাভূত হয়েছিল। বিশাল বন্য দস্যুরা তাদের সুন্দর ঘরবাড়ি ও সুরক্ষিত গ্রামগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয়, তাদের সুশৃঙ্খল সুন্দর ভিটেমাটি সহায়-সম্পত্তি ধ্বংস করে, তাদের চমৎকার মন্দির এবং অতি মূল্যবান পশুচর্মে লিখিত বর্ণলিপি ধ্বংস করে। এমন কি বন্য দস্যুরা ঠান্ডা মাথায় অনেক গারো প্রবীণ জ্ঞানীগুণী, সাহসী যোদ্ধাদের হত্যা করেছিল। রাজার পথ নির্দেশনায় হঠাৎ আক্রমন থেকে বেচে যাওয়া গারোদের মধ্যে দুইদলে ভাগ হয়। একটি দল আরুরন্ধি নদীর পশ্চিম দিকের পাহাড়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। অপর আরেকটি বড় দল আসং তিব্বতগি্রি নামক জায়গায় বসতি স্থাপন করে। এই সব ইতিহাস, মিথ তাদের মূল্যবান পশুচর্মে খচিত ছিল । যার মধ্যে তাদের ইতিহাস, ধর্মীয় চর্চা, যুদ্ধ কলা, গুপ্ত বিদ্যা, সরকার-শাসনতন্ত্র এবং শিল্প চর্চা ইত্যাদি আচিক লিপিতে লেখা হয়েছিল।

কালের বিবর্তনে, তিব্বতগিরি নামক জায়গায় যেখানে বিচ্ছিন্ন ভাবে আচিক জনগোষ্ঠী বসতি স্থাপন করেছিল তা ক্রমে খরায় শুষ্ক ও অনুর্বর ভূমিতে পরিণত হতে লাগল। চাষযোগ্য জমি থেকে ফসলের উৎপাদন কমতে লাগল এবং আস্তে আস্তে ভূমি চাষের অযোগ্য হতে লাগল । অনাবৃষ্টি দেখা দিল । ফলে ধান, ভুট্টা এবং খাদ্যশস্য শুঁকিয়ে গেল এবং বীজও অঙ্কুরিত হলো না। ধান, ভুট্টা এবং অন্যান্য ফসল উৎপাদন ব্যর্থ হলো । আচিকরা দুর্ভিক্ষ ও অনাহারের সম্মুখীন হলো। তাই তারা অবশেষে দূর্ভাগা তিব্বতিগিরি ছেড়ে সূর্য যেদিকে অস্তমিত হয় সেদিকে যাত্রা শুরু করল। পথিমধ্যে তারা গারোয়ার ব্রি নামক স্থানে বিশ্রাম নিলো । তখন তাদের সাথে যেসব খাদ্যসামগ্রী মজুদ ছিল সব নিঃশেষ হয়ে গেল। পরবর্তীতে তাঁরা যে জায়গা খুঁজে পেল তা একবারে কঠিন, ঠান্ডা, এবং অনুর্বর ছিল । অনাহার, তৃষ্ণায় বিষন্ন আচিক তাদের আশেপাশের তুষার আবৃত স্থানের এমন কোন জায়গায় খাবারের সন্ধান পেল না। তুষারাছন্ন কিছু বৃক্ষ ও ঝোপ-ঝাড় চারিদিক অন্ধকারময় প্রকৃতি তখন ভয়ঙ্কর রূপ নিলো । খাদ্যের অভাবের কারণে সেই স্থানে অনেক সাহসী আচিক যোদ্ধার অনাহারে মৃত্যু হলো। এই জায়গাকে তারা রূপকুন্ড নামে অভিহিত করল যার অর্থ রূপালী শুভ্রের একটি বৃত্ত। অবশিষ্ট আচিকরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও শোচনীয় অনাহারের কাছে নতিস্বীকার করে তাদের মূল্যবান পশুচর্মে খচিত লেখা দলিল খেয়ে ফেলল। এই দৈন্য দুর্বিপাক এবং বিভ্রান্তির ধরুণ তারা তাদের মহা মূল্যবান গুপ্তবিদ্যার জ্ঞান, বর্ণমালা ভুলে গেল। তাঁরা ঊষার পতিত গারোয়ার ব্রি পরিত্যাগ করে পাহাড়ের পাদদেশ বরাবর চলতে লাগল। তখন তাঁরা একটি সমৃদ্ধ দেশ আবিষ্কার করল এবং সেখানে বসতি স্থাপন করেছিল। যেখানে প্রকৃতির অনুকূল পরিবেশে তুলনামূলকভাবে খুব আরাম-আয়েশে সহজ জীবনযাপন করে। ফলশ্রুতিতে যা তাদের শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উভয়কেই অলস করে তোলে।নতুন বসতিতে আচিকদের প্রধান চাহিদার বিষয় ছিল শুধুই খাদ্য ও বাসস্থানের। তাই তাঁরা এই অপরিহার্য চাহিদাগুলি অর্জনে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে কাজ করে। পরবর্তীতে যখন তাদের খাদ্যদ্রব্যের রসদ প্রচুর পরিমাণে হলো এবং বসবাসের জন্য আরামদায়ক নিরাপদ আবাস হলো। তখন তাঁরা পশুর চামড়ায় খচিক তাদের মূল্যবান দলিলের কথা অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে মনে পড়ল। যা তাদের পূর্বের নির্মম পরিস্থিতির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়ে অনিবার্য কারণে সেদ্ধ করে খেয়ে ফেলেছিল। যদিও হারানো লেখার রূপকে পুনরুদ্ধার করার অত্যাশ্চর্য বাসনা আচিকদের অনেক উদ্দ্যামী করে তুলেছিল । সেই লিখিত গ্রন্থগুলিকে পুনরায় মূল সৌন্দর্য দিয়ে পুনরুৎপাদন করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তারা এটা উপলব্ধি করল যে ইতিমধ্যে তাদের অতিপ্রিয় গ্রন্থের সম্পূর্ণ স্ক্রিপ্ট ভুলে গিয়েছে। শুধুমাত্র তাদের অতীত শিল্প, ইতিহাস এবং অভিজ্ঞতা স্মৃতিতে রয়ে গেছে। পরবর্তীতে অনেক গারো গবেষক, পন্ডিত বিশেষ করে বাংলাদেশের আচিক থকবিরিম বা বর্ণমালা তৈরির চেষ্টা করেছিলেন তাদের মধ্যে মি. মার্টিন রেমা, জন থুসিন রিছিল, ডানিয়েল রুরাম, অরুণ রিছিল প্রমূখ বিশষভাবে উল্লখযোগ্য। Read more 

Share This
error: Content is Copywrite!