fbpx
garo wangala danceWanna folk Dancegaro wangala dance

সীমাবদ্ধ জ্ঞানের বৃথা আস্ফালন

সীমাবদ্ধ জ্ঞানের বৃথা আস্ফালন

প্রনব নকরেক

গারো জাতি সত্যিকার অর্থে কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে ! সম্মুখে না পশ্চাতে ? সভ্য আর সুশিক্ষিত মানুষ মাত্রই সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার পক্ষে। আর তারা সেদিকেই অগ্রসর হয়। পেছনে ফিরে যেতে চায় না। তবে পেছনে বলতে কি বুঝি সেটাও দেখতে হবে। যা কিছু ব্যক্তি, সমাজ, দেশ, জাতি তথা বিশ্বমানবতার জন্য সত্য, কল্যাণ ও মঙ্গলকর তা সর্বদাই সব কালে, সকল সমাজে ও সকল মানুষের কাছে সমাদৃত। কিন্তু সভ্য তথা সুশিক্ষিতের ক্ষেত্রেই এ বাক্যটি প্রযোজ্য। আবার কিছু রীতি-নীতি, আদর্শ, সময় ও স্থানের ওপর নির্ভর করে। যেমন পাশ্চাত্যের লোকজন বিবাহ বহির্ভূত দৈহিক মিলনে লিপ্ত হলেও তারা অসভ্য হয়ে যায়নি। আর সমাজও তাদের নিন্দা করেনা এর জন্য। কিন্তু আমাদের এদেশের সমাজ ব্যবস্থায় যদি সেটা হয় আর যদি কেউ জানতে পারে তাহলে কতবার যে মুখ দিয়ে ছি ছি ছি শব্দটি বের হবে তার হিসেব নেই। আবার গ্যালিলিও যখন বলেছিলেন পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে তখন এর জন্য তাঁকে দু:খ ভোগ করতে হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে আমরা সবাই জানি পৃথিবী সত্যিই সূর্যের চারদিকে ঘুরে। তখন মানুষ যুক্তিকে অস্বীকার করেছিল কিন্তু বর্তমানে তা অস্বীকার করার কোন পথ নেই। যদি কোন পথ যদি খুঁজে পাওয়া যায় সে পথ হবে পেছনে ফিরে যাবার পথ। সামনের পথ নয়। আর এ সামনের পথ খুঁজে পেতে আর সে পথে হাঁটতে হলে আমাদের হতে হবে যুক্তিবাদী, রসবাদী, সুশিক্ষিত। প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন ‘সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত’।[i] স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে সবাই শিক্ষিত হতে পারে। কিন্তু সুশিক্ষিত হতে হয় নিজের প্রচেষ্টায়। আর সুশিক্ষিত হয়ে ওঠাই আমাদের লক্ষ্য। কিন্তু আমরা শিক্ষিত হওয়ার কাজটাই করে যাচ্ছি। সুশিক্ষিত হওয়ার চেষ্টা করছিনা। শিক্ষিত হওয়ার নামে বাঙালির চেতনা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, ঐতিহ্যকে ধারন করছি। আর আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমনই। কিন্তু আমার মনে হয় আমাদের মনে রাখা উচিৎ আমরা বাঙালি নয়, বাংলাদেশী। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে অবশ্যই বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি সম্বন্ধে আমাদের জানতে হবে। সেই হিসেবে বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্যকে এড়িয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই। কারণ বাঙালির ইতিহাস মানেই বাংলার ইতিহাস। আর বিশ্ব নাগরিক হয়ে ওঠার জন্য আমাদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে জ্ঞানার্জন অবশ্যম্ভাবী। কারণ জ্ঞানের কোন সীমা নেই। জ্ঞানকে সীমাবদ্ধ করে ফেললে চিন্তার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে যায়। আর চিন্তা সর্বজনীন না হলে সে চিন্তা স্বার্থবাদী হয়ে ওঠে। ফলে সে চিন্তার গ্রহণযোগ্যতা লোপ পায়। কিন্তু এর জন্য নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে ভুলে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আমাদের নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্যের চর্চা আমাদেরই করতে হবে। কেননা একটি জাতির জাগরণে তার নিজস্ব গৌরবময় ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের দেখাতে হবে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যূদয়ে আমাদের মতো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অবদান। করতে হবে আমাদের নিজস্ব ইতিহাসের অনুসন্ধান। আর এ কাজটি করার আপ্রাণ চেষ্টা যারা করে যাচ্ছেন তাদের সাধুবাদ দিতেই হয়। তারা যে নিজের খেয়ে বনের মোষ তারাচ্ছেন এর জন্য আমরা অনেক কৃতজ্ঞ। কারণ তাদের কল্যাণেই আমাদের মতো কিছু অজ্ঞ শিক্ষার্থীরা নিজের ইতিহাস সম্বন্ধে জানতে পারছি। আমাদের সুশিক্ষিত হতে হলে নিজে থেকেই নিজেদের ইতিহাস তথা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে জানা উচিৎ। তখনই আমরা সবকিছু বিচার বুদ্ধি ও যুক্তি দিয়ে দিয়ে বিবেচনা করতে পারব। অর্থাৎ সুশিক্ষিত হয়ে উঠব। তবে অনেকে হয়ত বলবেন নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে জানলেই যে কেউ কি সুশিক্ষিত হয়ে ওঠে? আমিও তা বলছিনা। তবে নিজেকেই যদি না জানলাম তবে অপরকে জানব কি করে? উপরেই প্রমথ চৌধুরীর বাক্যটির অবতারণা করেছি। সেটার মর্ম উপলব্ধি করতে পারলেই আমার মুক্তি।

এখন আসল কথায় আসা যাক। ধর্ম আর সংস্কৃতি নিয়ে অন্য সমস্ত জাতির মতো আমাদের গারো সমাজেও কম বিতর্ক নয়। যে জাতি জ্ঞান-বিজ্ঞানে, কাব্য-কলায় আর শিল্প-সংস্কৃতিতে সভ্য সে জাতি যেভাবে তার ধর্ম আর সংস্কৃতিকে বিবেচনা করবে সেভাবে বিবেচনা করার ক্ষমতা জ্ঞানশূন্য অন্য একটি অসভ্য জাতির থাকবেনা এটাই স্বাভাবিক। ধর্ম এবং সংস্কৃতি দুটোরই উদ্দেশ্য মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক উৎকর্ষতা বৃদ্ধি। এ উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া মানে তাদের স্বধর্ম ত্যাগ করা। তবে ধর্ম এবং সংস্কৃতিকে এক করে জল ঘোলা করলে চলবেনা। কেনানা ‘ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম’।[ii] ধর্ম সংস্কৃতির উপায় বা অনুসঙ্গ হতে পারে কিন্তু ধর্মকে সংস্কৃতি হিসেবে বিবেচনা করা বোকামি ছাড়া কিছু নয়।

প্রথমে ধর্মের কথাই বলা যাক। আমরা গারোরা ছিলাম সাংসারেক ধর্মাবলম্বী। কালের বিবর্তনে আজ আমরা প্রায় শতকরা ৯৯ ভাগ খ্রিস্টান। তবে এই খ্রিস্টানের মধ্যে আবার নানা ভাগ আছে। কেউ রোমান ক্যাথলিক, কেউ ব্যাপটিষ্ট, কেউ চার্চ অব বাংলাদেশ, আবার কেউবা অন্য কোন চার্চের। এমনি করে আমরা নানা চার্চে বিভক্ত। আর সেটাই হয়েছে কাল। রোমান ক্যাথলিক এবং প্রটেস্টান্টরা গত ১৬০০-১৭০০ খ্রিস্টাব্দে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিল। সেই দ্বন্দ্ব হতে তাদের ঐক্যে পৌঁছাতে প্রায় ১৩০ বছর লেগে গেছে। কিন্তু এই দ্বন্দ্ব কোন পক্ষই লাভবান হয়নি। বরং যারা দ্বন্দ্বকে এড়িয়ে গেছে তারাই বুদ্ধিমানের কাজ করেছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। পূর্ব ইতিহাস হতে শিক্ষা নিয়ে ভুলত্রুটি শোধরে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। তা না হলে সেই একই ইতিহাস রচিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বরঞ্চ এ ইতিহাস পূর্ব হতে আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে আমাদের যুক্তিবিচারের অভাবে। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথাটি প্রণিধানযোগ্য-‘যেখানে মানুষ একত্রিত হয়েছে কিন্তু মিলতে পারেনি সেখানে সভ্যতা গড়ে উঠেনি’।[iii] অর্থাৎ পূর্বে হয়ত ক্যাথলিক এবং প্রটেস্টান্ট ঐক্যে পৌঁছেছিল কিন্তু মিলতে পারেনি। তা না হলে আজ আমরা মিলনের সুবাতাস পেতাম। আর আমরা যদি বাঙালি জাতির দিকে তাকাই তাহলে বুঝতে পারি ধর্ম কতটা বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিংশ শতাব্দীতে তাদের জাতীয় জীবনে। ১৯৪৬ সালের হিন্দু মুসলমান দাঙ্গায় বহু মানুষ হতাহত হয়েছিল। আজও যে একেবারে তা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সেটা বলা যায় না। তার প্রমাণ আমরা প্রতি বছরই প্রায় দেখতে পাই। অবশ্য সেময় ব্রিটিশদের ক্ষমতা ধরে রাখার একটা কৌশল ছিল হিন্দু ও মুসলমানদের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি। তেমনি আমরাও যদি ধর্ম নিয়ে নিয়ে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে অন্য কোন শক্তিকে কর্তৃত্ব করার সুযোগ করে দিই সেটা হবে চরম বোকামি। বাঙালি মুসলমান সমাজ পিছিয়ে পড়ার কারণ যেমন ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি কুসংস্কারাচ্ছন্নতা তেমনি একই কারণ হতে পারে আমাদের ক্ষেত্রেও। যদিও পরবর্তীতে কাজী আবদুল ওদুদের (১৮৯৪-১৯৭০) মতো প্রগতিশীল চিন্তাচেতনার অগ্রপথিকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ‘শিখা ‘(পত্রিকার মূলসুর ছিল-‘ জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’) পত্রিকাকে কেন্দ্র করে মুক্তবুদ্ধি চর্চার মাধ্যমে তারা সম্মুখে অগ্রসর হয়। আমাদেরও সেইদিকে অগ্রসর হওয়া উচিত।

হয়তো বলছেন ধর্ম নিয়ে এসব কথা কেন গারো জাতির ক্ষেত্রে। পূর্বেই আমি একটা বাক্যের অবতারণা করেছি। যেটা কাল হয়ে দেখা দিয়েছে বলেছি সেটা যে ভবিষ্যতে আমাদের জাতীয় জীবনে বড় বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিবেনা সেটা বলা যায় না। তাই আমাদের ধর্মীয়, সমাজ নেতাদের এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কেননা যখন দেখি একজন ব্যাপটিস্ট বা ক্যাথলিক চার্চের ছাত্র/ছাত্রী তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান তথা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারেনা তখন খুব হতবাক হতে হয়। ধর্ম তো মানুষেরই সৃষ্টি। আর সেটা নিজের কল্যাণের জন্যই। ঈশ্বর তো বলেনি অন্যের ক্ষতি করে তার আরাধনা করতে। কাউকে শিক্ষা হতে বঞ্চিত করে তার সেবা করতে। তবে আমরা কেন সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও সেটা বুঝতে পারিনা। নাকি ঈশ্বর তার থেকেও মহোত্তম করে আমাদের সৃষ্টি করেছেন। তাই হতে পারে। তা না হলে আমরা এমন করব কেন। আজ অনেক গ্রামের গারো সমাজ (যেখান খ্রিস্টান ধর্মের বিভিন্ন চার্চ বিদ্যমান) ধর্মীয় দিক থেকে বিভক্ত। অনেক সময় সে বিভক্ত থেকে বিবাদের সৃষ্টি হয়। যা আমাদের জন্য কাম্য নয়। তাই ধর্মকে বুদ্ধিবাদ ও রসবাদ দিয়ে বিবেচনা করা উচিৎ। তবেই মনুষ্য তথা জাতীয় জীবন সুন্দর হয়ে উঠবে।

এছাড়াও দেখা যায় খ্রিস্টান ধর্মকে আমরা আমাদের সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্য করে গ্রহণ করিনি। ধর্মকে গ্রহণ করেছি বাঙালি সংস্কৃতির আদলে। যা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যদিও বর্তমানে এর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। আমরা নিজের ভাষায় উপাসনা পরিচালনা করছি। যা খুবই আশার কথা। তবে এক্ষেত্রে গারো ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা আমরা আরো আশা করি। যদি না হয় হয়ত ভবিষ্যতে আমরা খ্রিস্টানত্বকেই নিজের সংস্কৃতি হিসেবে চালিয়ে দেব। মনে রাখা প্রয়োজন খ্রিস্টানত্ব পরিবর্তন হতে পারে কিন্তু জাতিত্ব পরিবর্তন হওয়ার নয়। তবে এক্ষেত্রে আমি উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দিতে চাচ্ছি না। কেননা এসব প্রবলভাবে না থেকে প্রচুরভাবে থাকাই শ্রেয় ও কল্যাণকর।

এবার আসা যাক সংস্কৃতির কথায়। একটি জাতিকে ভালভাবে জানতে, বুঝতে হলে তার সংস্কৃতিকে জানতে হবে। তার আচার-ব্যাবহার, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, তার সমাজে বিদ্যমান নীতি, আদর্শ, সংস্কার সবকিছুই সে জাতির পরিচয়কে বহন করে। যে জাতি যত সংস্কৃতিবান সে জাতি তত সভ্য। তবে তার আগে আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। যদি না হয় অপসংস্কৃতি আমাদের কাছে সংস্কৃতি হিসেবে পরিচিত হবে। আর তা যদি কোন জাতির জাতীয় জীবনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয় সে জাতি সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতিকেই চর্চা করবে। সে বিষয়ে সন্দেহ করার কোন অবকাশ নেই। সংস্কৃতি হচ্ছে ‘সুন্দরের সাধনা’।[iv] সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্য, চিত্রকলা আমাদের মনে সুন্দরের অনুভূতি সৃষ্টি করে বলেই আমরা এসবের চর্চা করি। তবে সুন্দর বলতে যদি মোহকর কিছুকেই বুঝে থাকি সেটা হবে ভুল। সেই সুন্দরকে হতে হবে সত্যাশ্রয়ী, জীবন ও জগতের সাথে সম্পর্কিত এবং তার গতিকে হতে হবে সার্থকতা লাভের দিকে ধাবিত। হতে হবে স্বার্থপরতা বর্জিত। তাই আমরা যখন এই সুন্দরের সত্যকে লালন করব, উপলব্ধি করার চেষ্টা করব এবং সার্থকতা লাভের আকাঙ্কা আমাদের মনের মধ্যে জাগবে তখনই সংস্কৃতিকে ভালভাবে বুঝতে পারব। আর তখনই সুসভ্য হয়ে উঠব। অন্যথায় নয়। কোন কিছুর প্রাচীনতাই সংস্কৃতি হতে পারেনা। আর সেটা নিয়ে গৌরব করার কিছু নেই। গৌরব করে তার চর্চা করা চরম নির্বুদ্ধিতার পরিচয়। অতীত আর বর্তমানের সম্মিলনেই ভবিষ্যৎ সুন্দর হয়ে ওঠে। নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য কূর্মবৃত্তি অবলম্বন নয়। আর সেটা করলে সেই অস্তিত্ব ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে বাধ্য। যদি অন্ধকারে আমাকে কেউ দেখে ফেলার ভয়ে আমি আলো না জ্বালিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হই তবে আমার যেমন হোঁচট খেতে হবে তেমনি গর্তে পরার সম্ভাবনাও থেকে যায়। তা কূর্মের মতো চক্ষু, মস্তককে ভিতরে গুজে অন্ধকারে হাঁটা নয় বরং আলো জ্বালিয়ে অগ্রসর হওয়া শ্রেয়।

সংস্কৃতি আমাদের গারো জাতীয় জীবনের সাথে ওতোপ্রতভাবে জড়িত। আসলে জীবন যাপনের রীতি-নীতি, আচার-আচরণ, আদর্শ, খাদ্যাভ্যাস, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্যের মাধ্যমে কোন জাতি তথা গোষ্ঠীর যে অভিব্যক্তি প্রকাশিত হয় সেটাই সে জাতির সংস্কৃতি হিসেবে বিবেচ্য। তবে তা সত্য ও সুন্দর কিনা সেটাই মূখ্য বিষয় (বাংলা ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি ইংরেজি ‘Culture’ শব্দের প্রতিশব্দ, গারো ভাষায় এর প্রতিশব্দ ‘দাকবেওয়াল’ )। যার অর্থ সংস্কৃতি, প্রথা, রেওয়াজ, আচার-আচরণ, রীতিনীতি, আইন-কানুন, নিয়ম-কানুন, করণীয়।[v] ধর্ম যেহেতু জীবন যাপনের রীতি নীতির একটা অংশ তবে সেটা সংস্কৃতিরও একটা অনুসঙ্গ।

আমরা গারোরা সাংসারেক ধর্ম থেকে কালের বিবর্তনে খিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হই। সাংসারেক ধর্মে আমাদের দেবতা ছিল তাতারা রাবুগা, মিশি সালজং, সুসিমে, চুরাবুদি, কালকামে, গোয়েরা এমনি আরো অনেক দেবতা। তাতারা রাবুগা ছিল আমাদের প্রধান দেবতা। আজ খিস্ট ধর্মে দীক্ষিত বলে ঈশ্বরকে আমরা প্রভু বলে মান্য করি। অনেকেই আমাদের সাংসারেক ধর্মের সাফাই গেয়ে থাকেন। তারা বলতে চান সাংসারেক ধর্ম গারোদের সংস্কৃতির অনুসঙ্গ। আমিও তা মানি। কিন্তু এ ধর্মকে অনুসরণ করা তথা জীবনের জন্য চর্চা গারোদের কর্তব্য তা মানতে আমি নারাজ। তাদের চিন্তাশক্তি, বিচারবুদ্ধির বিশালতা সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে। কেননা আমি পূর্বেই বলেছি ধর্ম মানুষের কল্যাণের জন্যই। সময়ের সাথে এর নীতি পরিবর্তনীয়। আমরা যে সূর্যকে দেবতা বলে পূজা করতাম বর্তমানে সবাই জানে সে দেবতা একটি নক্ষত্র মাত্র। সুতরাং তার আরাধনা করা হাস্যকর হয়ে দাঁড়ায়। তাই প্রাচীনতাকে আঁকরে ধরে থাকাই নিজের অস্তিত্ব তথা সংস্কৃতিকে রক্ষা করা নয়। বরং সেটা করা মানে নিজেকে দমিয়ে রাখা। অন্যদের থেকে পিছিয়ে যাওয়া। তেলাপোকার মতো টিকে থাকা । কেননা ‘সংস্কৃতি মানুষের শৌখিন পোশাক-পরিচ্ছদ নয়, তা তার জীবনযুদ্ধের অস্ত্র-আর অস্ত্রের প্রাচীনতাই তার গৌরবের বিষয় নয়’।[vi] তাই বলে আমি বলছিনা নিজের অতীত ইতিহাসকে অস্বীকার করতে বা ভুলে যেতে। আর যদি সেটা করি তবে জাতি হিসেবে আরও নীচতার পরিচয় দেওয়া হয়। কেননা সংস্কৃতির সংঙ্গা দেয়া হয়-অতীতের শ্রেষ্ঠ ভাবসম্পদের সমাহার”।[vii] মানবজাতির ইতিহাস বলে মানুষ প্রাচীনকালে গুহায় বাস করত। সেটা তার অতীত। কিন্তু তাই বলে মানুষ বলতে পারেনা তাকে বর্তমানেও গুহাতে বাস করতে হবে। আর যদি সেটা হতো তাহলে মানবসভ্যতার ইতিহাস ঐ গুহাতেই আবদ্ধ থাকত। সে আর আধুনিক সভ্যতায় পৌঁছতে পারত না। তাই বলে সে যে গুহায় বাস করত সেটা ভুলে যায়নি। কারন সেটাই তার অতীত ইতিহাস।

‘ওয়ানগালা’ আমাদের গারো সংস্কৃতির আরেকটি অনুসঙ্গ। বর্তমানে এই ‘ওয়ানগালা’ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হতে দেখা যায়। অতীতে এই ওয়ানগালা কীভাবে পালন করা হতো বর্তমানে কীভাবে করা হচ্ছে, আর কীভাবে করা উচিৎ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অনেক সময় আলোচনা হতে দেখা যায়। আমার কথা হচ্ছে অতীতকে যদি স্মরণ করতেই হয় তবে সেটা অতীতের মত করেই স্মরণ করা উচিৎ। এই স্মরণ করার অর্থ এই নয় যে অতীতকেই বর্তমানে চর্চা করা। যদি আমরা জীবনের জন্য চর্চা করি তাহলে সেটাকে যুগোপযোগী করে চর্চা করাই শ্রেয়। আবার যদি সেটা শুধু স্মরণ তথা প্রদর্শনের জন্য হয় তাহলে তার স্বরূপের পরিবর্তন কাম্য নয়। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা যাক। পূর্বে তাল পাতা গেঁথে বা গ্রন্থিত করে লেখা হত বলে গ্রন্থ নামে অভিহিত হলেও বর্তমানে তাল পাতায় লেখা হয়না। যুগের সাথে সামঞ্জস্য রেখে, যুগের চাহিদার তাগিদে আজ মানুষ তাল পাতার পরিবর্তে উন্নত যন্ত্রের সাহায্যে প্রস্তুতকৃত কাগজ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কেউ বলেনা তাল পাতার পরিবর্তে কাগজ ব্যবহার করা যাবেনা অর্থাৎ তাল পাতাই ব্যবহার করতে হবে। যদি কেউ সেটা করে সে বর্তমান থেকে অনেক বছর পিছিয়ে যাবে। তাই আমার কথা হচ্ছে জীবনের জন্য কোন কিছু চর্চা করলে সেটাকে আপডেট করে নিতেই হবে আপনাকে। কেননা আপনার কাঠের তৈরি আলমারি বহুদিন ব্যবহারের পর যদি সেটা নষ্ট হয়ে যায় তবে আপনাকে মেরামতের ব্যবস্থা করতে হবে নয়তো নতুন করে ক্রয় করতে হবে। ‘ওয়ানগালা’ অনুষ্ঠানকেও এই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিবেচনা করা উচিৎ।

ওয়ানগালা ( আগাল-মাকা, আচিরকা, রংচুগালা ) অনুষ্ঠানের সাথে গারো সংস্কৃতির আরেকটি অনুসঙ্গ ‘চ’ (মদ ) অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। এসব অনুষ্ঠানে পানাহার করে সবাই নাচে গানে মশগুল হতো। কিন্তু বর্তমানে এসব অনুষ্ঠানে অনেকে মদ্যপান করে আনন্দ করার নামে মাতলামি করে। অতীতেও যে এমন মাতলামি হয়নি সেটা বলা যায়না। কিন্তু বর্তমানের মাতলামি আমাদের জন্য শুভকর নয়। কেননা এসব অনুষ্ঠানের প্রেক্ষাপট বদল হয়েছে। আমাদের যে কৌম সমাজ ছিল সেটা আজ ভেঙে যাচ্ছে। এ কৌম সমাজে আমরা ঘরোয়াভাবে এসব অনুষ্ঠান উদযাপন করতাম। কিন্তু আজ রাজধানী ঢাকা শহরে আমরা ঘটা করে ওয়ানগালা অনুষ্ঠান উদযাপন করছি। আমাদের বাঙালি ও বিদেশি ব্ন্ধুরা এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছে। সুতরাং আমাদের বুঝতে হবে কোনটা উচিৎ কোনটা অনুচিৎ। এছাড়াও এই পানীয়কে আমরা যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছি। গবেষক সুভাষ জেংছাম তার ‘বাংলাদেশের গারো আদিবাসী’ গ্রন্থে চোলাই মদের বানিজ্যিক ব্যবহার ও ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আজকে একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় গারোরা নিজস্ব তৈরিকৃত মদের (ধেনো পঁচুই মদ ) বানিজ্যিকীকরণ কোন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এর ফলে পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় যেমন ঘটেছে তেমনি যুবসমাজ রসাতলে যাচ্ছে। যেসব গারো পরিবারে মদ বিক্রি হচ্ছে সেসব পরিবারে বাঙালিদের মদ্যপ অবস্থায় আড্ডা বাড়ছে। এমনকি স্কুলপড়ুয়া গারো ছেলেরা পড়াশুনা বাদ দিয়ে ঐসব পরিবারের কাছ থেক মদ ক্রয় করে পান করছে নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট করছে। ঢাকা শহরেও যে মদ ব্যবসায়কে অনেকে (গারো) পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে সে কথা না বললেও বোধ হয় চলবে। আমি ‘চু’ (মদ) এর বিপক্ষে নই। এর সঠিক ব্যবহার এবং আমাদের সচেতনতা খুবই প্রয়োজনীয়। তবে মনে রাখা প্রয়োজন যা আমাকে ক্রমশ ধ্বংশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তা সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন বুদ্ধিমানের কাজ। নতুবা নিজেকে একসময় আমরা খুঁজে পাবনা।
উপরে সংস্কার কথাটা অনেকবারই ব্যবহারই করেছি। কিন্তু সংস্কারমুক্তিকেই সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দিলে চলবেনা। এদের মাঝে সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান। কেননা প্রাচীন কোন স্থাপত্যকে যদি আমি আমার স্বার্থে ব্যাবহার করার জন্য তার মূল নকশা থেকে ভিন্ন করে সংস্কার করি তবে সেই প্রাচীন স্থাপত্য তার স্বকীয়তা হারাবে। তাই সেই স্থাপত্যের সংস্কার তার মূল নকশা অনুযায়ী করা শ্রেয়। সংস্কারমুক্তি সংস্কৃতির একটি শর্ত হলেও অনিবার্য নয়। এক্ষেত্রে মূল্যবোধ হচ্ছে সংস্কৃতির অনিবার্য শর্ত। যেমন মানুষের চুল থাকলে সুন্দর দেখায় বটে আবার না থাকলেও চলে (টাকলা হলে কিছুটা কুৎসিত দেখালেও অনিবার্য নয়)। কিন্তু মস্তিষ্ক বিকৃত হলে সে একেবারে বাতুল হয়ে যায়। তাই মানুষের কাছে সুস্থ মস্তিষ্ক যেমন চুলের থেকে অনিবার্য তেমনি সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সুস্থ মস্তিষ্ক স্বরূপ মূল্যবোধ সংস্কারমুক্তির থেকে অনিবার্য। অর্থাৎ মূল্যবোধ ছাড়া সংস্কৃতি অসম্ভব। আমাদের মাঝে মূল্যবোধ জাগ্রত হলেই বলতে পারব ‘সংস্কৃতি মানে সুন্দর ভাবে, বিচিত্র ভাবে, মহৎ ভাবে বাঁচা, প্রকৃতি-সংসার ও মানব সংসারের মধ্যে অসংখ্য অনুভূতির শিকড় চালিয়ে দিয়ে বিচিত্র রস টেনে নিয়ে বাঁচা’।[viii]

এবার যবনিকা টানার দিকে মনোযোগ দেয়া যাক। অনেক কথাই লিখে ফেললাম নিজের সামান্য ধার করা জ্ঞান দিয়ে। মাঝে মাঝে এমন কথার উল্লেখ করেছি যার উল্লেখ হয়তো স্বয়ং বিদ্যাসাগর করার সাহস পেতেন না। এসব ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে অবলোকন করবেন এটাই আশা।

তথ্য নির্দেশিকা

[i] বই পড়াঃ প্রমথ চৌধুরী

[ii] সংস্কৃতি কথাঃ মোতাহের হোসেন চৌধুরী

[iii] কালান্তরঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ( ১৯৩৭)

[iv] সংস্কৃতির কথাঃ কাজী অাবদুল ওদুদ

[v] ব্যবহারিক গারো অভিধানঃ হিমেল রিছিল সম্পাদিত

[vi] প্রাগুক্ত (৪)

[vii]  প্রাগুক্ত (৪)

[viii] প্রাগুক্ত (২)

  • গারো সম্প্রদায়: সমাজ ও সংস্কৃতি (ড. মাযহারুল ইসলাম তরু সম্পাদিত)
  • বাংলাদেশের গারো আদিবাসী: সুভাষ জেংচাম
  • ক্ষমতা: বার্ট্রান্ড রাসেল ( আরশাদ আজিজ অনূদিত)

Share This
error: Content is Copywrite!