Wanna folk Dancegaro wangala dancegaro wangala dance

গারো উত্তরাধিকার আইন

গারো উত্তরাধিকার আইনকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়। গারোদের প্রচলিত মাতৃতন্ত্র অনুযায়ী কোন পুরুষ কোন প্রকার সম্পত্তির অধিকারী হইতে পারে না।

গারো উত্তরাধিকার আইন

রেভারেন্ড সি.ডি বল্ডুইন

গারো উত্তরাধিকার আইনকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়। ১. সাধারণ আইন। ২. পরিবার বিষয়ক আইন। ৩. পোষ্যাকন্যা বিষয়ক আইন। ৪. উইলকৃত সম্পত্তি আইন। ৫. স্বত্বচ্যুত সম্পত্তি আইন।

গারো সাধারণ আইন

১. গারোদের প্রচলিত মাতৃতন্ত্র অনুযায়ী কোন পুরুষ কোন প্রকার সম্পত্তির অধিকারী হইতে পারে না। পুরুষ সন্তান বয়ঃপ্রাপ্ত হউক বা না হউক সে যাহা কিছু অর্জন করে বা অন্যের নিকট হইতে লাভ করে সমস্তই তাহার মাতার বা ভগ্নীদের সম্পত্তি হইবে। বিবাহিত পুরুষ যাহা কিছু অর্জন করে সমস্তই তাহার পত্নীর সম্পত্তি হইবে বা পত্নীর বিয়োগ ঘটিয়া থাকিলে তাহার কন্যার সম্পত্তি হইবে। মাতা বা পত্নীর বা কন্যা বা ভগ্নীদের মৃত্যু ঘটিয়া থাকিলে পুরুষের অর্জিত সম্পত্তি তাহার নিকটতমা আত্মীয়ার হইবে।

২. পুরুষ লোক তাহার নিজ বাড়িতেও কোন সম্পত্তি বিক্রয় বা দান বা অপসারণ করিতে পারে না। তাহা করিতে চাহিলে তাহাকে অবস্থা বিশেষে পত্নীর বা মাতার বা ভগ্নীদের অনুমতি লইতে হইবে। সে অনুমতি ছাড়া সম্পত্তি বিক্রয় বা দান বা অপসারণ করিলে, গারো আইনে তা চুরি করা হয় বলে গণ্য। কোন কোন অবস্থায় সে অনুমতি ছাড়া পরিবারের কল্যাণার্থে বা প্রয়োজনবশত সম্পত্তি হস্তান্তর করিতে পারে; তখন তাহা সৎ উদ্দেশ্যে ও পরিবারের স্বার্থে করিতে হইবে। তাহার পত্নীর, কন্যা ও চ্রা বর্গ দুই এক বৎৎসরে র মধ্যে কোন আপত্তি না করিয়া থাকিলে বুঝইবে যে তাহারা তাহারা তাহার সমর্থন করিয়াছে।

৩. একান্নবর্তী পরিবারের সম্পত্তি বন্টনের প্রশ্ন উঠে না। একান্নবর্তী পরিবার হইতে কেহ পৃথক হইতে চাহিলে সম্পত্তি বন্টন আবশ্যক হয়। সাধারণত যাহারা স্বেচ্ছায় পৃথক হইয়া যায়, তাহারা পারিবারিক সম্পত্তিতে স্বত্ব হারায়। কিন্তু জোর করিয়া তাহাকে পৃথক করা যায় না। পৃথক করিবার পূর্বে একটা বৈঠক আহ্বান করিয়া তাহাদের জন্য ভূ-সম্পত্তির অংশ স্থির করিতে হয়।

৪. জামাতার পরিবারস্থ আত্মীয় বর্গকে কোন কিছু দেওয়া হইলে তাহাকে “অনচাকা” (কর্জ) বলা হয় এবং জামাতার পরিবারস্থ আত্মীয়বর্গের তাহা ফেরত দিতে হইবে।

৫. ন্যাসরক্ষককে বা ন্যাসরক্ষকগণকে যে সম্পত্তির ভার দেওয়া হয়, হিসাব চাহিলে তাহাকে বা তাহাদেরকে ঐ সম্পত্তির হিসাব দিতে হইবে।

৬. কোন মাচং অন্য মাচং এর নিকট সম্পত্তির স্বত্ব হস্তান্তর করিতে চাহিলে, বা নানা কারণে স্বত্বত্যাগ করিতে বাধ্য হইলে তদুদ্দেশ্যে একটা বৈঠক ডাকিতে হইবে। ঐ বৈঠকে উভয় গোত্রের প্রতিনিধিগণ উপস্থিত থাকিয়া স্বত্ব হস্তান্তর করিবে।

৭. যদি কেহ পুত্রের বিবাহ দিয়া নিজ বাড়িতে পুত্রবধু আনে, তবে পুত্র ও পুত্রবধু পিতামাতা হইতে পৃথক খাইবে ও বাস করিবে, ইহাই আশা করা যায়। পৃথক হওয়া মাত্র শাশুড়ি তাহাদের জন্য ছয় মাসের খোরাক ও দুইটা বলদ দিবে (ইহা স্বেচ্ছাকৃত দান)। যাহারা অত্যন্ত গরীব তাহারা এই নিয়ম রক্ষা করে না। যাহারা সচ্ছল তাহার এই নিয়ম পালন করে; ইহা বাধ্যতামূলক নহে। (গারো হিলসে এই নিয়মের প্রচলন নাই। সেখানের নিয়ম হইল, নকনা ও তাহার স্বামী চ্রা বর্গের অনুমতি লইয়া বা নকন্যা তাহার নিজের সামর্থ্য ও অবস্থা অনুযায়ী ভগ্নির প্রতি দয়া করিয়া কিছু করিতে পারে)।

৮. যে কোন অধিকার (আখিম বা খিম) চিরস্থায়ী। অর্থাৎ একটা মাচং অন্য একটা মাচং এর উপর পুরুষ পরম্পরায় গ্রো দাবী করিতে পারে।

৯. কোন পুরুষ দ্বিতীয়া পত্নী গ্রহন করিতে চাহিলে প্রথমে বর্তমান পত্নীর ও চ্রা বর্গের সম্মতি লইতে হইবে। তাহাদের সম্মতি ছাড়া দ্বিতীয়া পত্নী গ্রহণ অবৈধ গণ্য হইবে।

১০. পত্নী স্বামী ত্যাগ করিয়া অন্য পুরুষকে বিবাহ করিলে বা অন্য পুরুষের সঙ্গে বাস করিলে সে তাহার পরিত্যক্ত সম্পত্তির স্বত্ব হারায় (গোকার মামলা, মাঘমারার ৪ মাইল উত্তরে গোকা) । উক্ত ক্ষেত্রে সম্পত্তি কিছুকালের জন্য পরিত্যক্ত স্বামীর হাতে থাকিবে। পরিত্যাগ প্রমাণিত হইলে। পরিত্যাগকারিণীর পত্নীটা পরিত্যাগকারিণীর সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারিণী হইবে। মৃতা পত্নীর চাচ্চিবর্গ বিপত্নীকে অন্য একজন পত্নী দিতে অপারাগ হইলে, সম্পত্তি পত্নীর চ্রা ও চাচ্চিবর্গের হাতে ফিরিয়া যাইবে।

১১. মৃতা পত্নীর চাচ্চিবর্গ যদি বিপত্নীকে একজন স্ত্রী দিতে অপারগ হয় ও ‘খিমমুক্ত’ করে অথবা তাহারা যদি তাহাকে পত্নী দিতে না চায় এবং ‘খিম’ মুক্ত করিতেও অস্বীকার করে, তবে বিপত্নী যে কোন পত্নী গ্রহণ করিতে পারে। কিন্তু নূতন পত্নী মৃতা পত্নী সম্পত্তির কিছুই দাবি করিতে পারে না, যতি সে একই মাচং এর মা হয় বা মৃতা পত্নীর চাচ্চিবর্গের দ্বারা স্বীকৃত না হয়।

১২. পত্নী অন্য পুরুষের সঙ্গে ব্যভিচার করিলে এবং পুরুষদ্বয়ের একজন অন্যজনকে বিষ প্রয়োগ করিতে ঐ স্ত্রীলোককে প্ররোচিত করিলে, যাহাকে বিষ প্রয়োগ করা হয় তাহার মাতা বা মাতার নিকটতমা আত্মীয়া ব্যভিচারিণীর সম্পত্তি দাবি করিতে পারে। কাহারো কাহারো মতে ৩০০ টাকা হইতে ৪০০ (চারিশত) টাকা গ্রো দিলেই যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ হয়।

সাধারণত ব্যভিচারিণীকে সম্পত্তি হইতে বঞ্চিত করা হয়; সম্পত্তি তাহার কন্যাগণের অধিকারে যায়। (ব্যভিচারী পুরুষের কন্যাগণের অধিকারে যায় না) স্বামীর কোন কন্যা না থাকিলেও ব্যভিচারিণীর চাচ্চিবর্গ স্ত্রীলোকটির নিকটতমা আত্মীয়াকে সম্পত্তির অধিকারী দান করে। ব্যভিচারিণীর চাচ্চিবর্গ যাহাকে বিষ প্রয়োগ করা হইল সে পুরুষের লোকদের নিকট স্বামী দাবি করিতে পারে না কিন্তু ঐ পুরুষের লোকেরা আখিম দাবি করিতে পারে যদি ঐ পুরুষের মাচংয়ের বাহিরে কাহাকেও ঐ স্ত্রীলোকটি বিবাহ করে।

১৩. যে কন্যা পিতার মাচংয়ের মধ্য হইতে স্বামী গ্রহণ করে; কিন্তু স্বামীর সংগে অন্যত্র বাস করিতে যায়, সে ‘নকনা’ হইতে পারে না। ব্যবসার প্রয়োজনবশত বা অন্য কোন কারণে অন্যত্র বাস করিতে হইলে সে নকনা হইতে পারে।

১৪. পিতা মাতা তাহাদের সম্পত্তি বিক্রয় করিবার বা বন্ধক দিবার পূর্বে তাহাদের সাবালিকা কন্যাগণের পরামর্শ লইবে। মাতা সুস্থ মস্তিষ্ক হইলে কন্যাগণ কোন প্রকার দাবি তুলিতে পারে না। মাতা (Imbecile) জড়বুদ্ধি হইলে বা সম্পূর্ণ অক্ষম (Invalid) হইলে তাহার দ্বারা সম্পন্ন বিক্রয় বা বন্ধক বয়স্কা কন্যাগণ বাতিল করিতে পারে।

১৫. কোন পুরুষ স্বেচ্ছায় পরস্ত্রীর স্তন স্পর্শ করিলে সে পাঁচ টাকা জরিমানা দিতে বাধ্য থাকে। সে যদি ব্যভিচারের উদ্দেশ্য লইয়া স্তন স্পর্শ করিয়া থাকে, তাহার জরিমানা ৩০ টাকা হইতে ৬০ টাকা পর্যন্ত হইতে পারে। ব্যভিচারের উদ্দেশ্য ছিল বলিয়া প্রমাণিত হয় যদি পত্নীর স্বামীর দাবি অগ্রাহ্য করে।

১৬.  গারো আইন অনুমতি দেয় যে, স্বামী পত্নীকে মারিতে পারে; কিন্তু স্বামীকে স্ত্রী মারিবে এই অনুমতি গারো আইনে নাই। স্ত্রী স্বামীকে মারিলে তাহার সবচেয়ে হৃষ্টপুষ্ট বলদ বা শূকর স্বামীর ভ্রাতা ও অন্য আত্মীয়াগণ মারিয়া খাইতে পারে। তজ্জন্য পত্নীকে ক্ষতি বহন করিতে হইবে। ইহাকে বলা হয় “গিৎতক চাআ”।

গারো পরিবার বিষয়ক আইন

১. মাতাপিতা তাহাদের কন্যাদের একজনকে মাতৃ-সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী মনোনীত করে। এই কন্যাকে “নকনা” বলা হয়। নকনার স্বামীই ‘নক্রম’ হয়। কে ‘নকনা’ হইবে তাহা মাতাপিতার মনোনয়নের উপর নির্ভর করে। মনোনয়নের ব্যাপারে পিতা ও মাতা যদি একমত হইতে না পারে তবে মাতার মনোনয়নই মানিয়া লইতে হয়। অর্থাৎ মাতা যাহাকে মনোনীত করে সেই ‘নকনা’ হইবে।

২. নকনা তাহার পিতৃ-গোত্রের একজনকে বিবাহ করিতে বাধ্য। তাহা না করিলে মাতৃ-সম্পত্তির উত্তরাধিকার হইতে তাহাকে বঞ্চিত করা হইবে। ‘নকনা’ যদি নক্রমকে বিবাহ না করে, মনোনীত ‘নক্রম’ জামাই তখন বিবাহের দাবি করিতে পারে না, সম্পত্তির দাবিও করিতে পারে না। সে সম্ভবত মানহানি বা অপমান বাবদ ৫ টাকা দাবি করিতে পারে।

৩. নকনা রূপে মনোনীতা কন্যা পিতৃ-গোত্রে বিবাহ করিলেও মাতৃ সম্পত্তি ছাড়িয়া বধূরূপে অন্য সম্পত্তিতে চলিয়া গেলে, সে সম্পত্তির অধিকার হারায়। তখন তাহার যে ভগ্নীগণ পিতৃ-গোত্রে বিবাহ করিল, তাহাদের একজন বা একাধিকজন ঐ সম্পত্তি দাবি করিতে পারে। নকনার সমস্ত ভগ্নীই পিতৃগোত্রে বিবাহ করিয়া থাকিলে মাতার ও নকনার মৃত্যুর পর মাতৃ-সম্পত্তির সমান-সমান অংশে তাহাদের প্রত্যেকেরই অধিকার আছে।

৪. নকনার ভগ্নীগণকে বলা হয় “আগাতী”। আগাতীরা যদি পিতৃ-গোত্র ছাড়া অন্য গোত্রে বিবাহ করে তাহার মাতৃ-সম্পত্তির কিছুই দাবি করিতে পারে না। যদি তাহাদের কোন দাবি মানিয়া লওয়া হয় তবে অনুগ্রহটা মাতা-পিতার অনুরোধক্রমে করা হয়।

৫. নকনা কন্যা সন্তান না রাখিয়া মরিয়া গেলে, তাহার ভগ্নী বা ভগ্নীগণ তাহার সম্পত্তি পাইবে। ভগ্নী না থাকিলে তাহার ভগ্নীগণ সম্পত্তি পাইবে। কিন্তু নক্রম যদি মৃতা পত্নীর কোন ভগ্নীকে বিবাহ করে, তবে এই ভগ্নীই সমস্ত সম্পত্তি পাইবে (জিরেন ও সরমনি, তারাগড়া) ।

৬. পিতার দুর্ব্যবহার বা অত্যাচারবশত: নকনা যদি সম্পত্তি পরিত্যাগ করিয়া অন্যত্র যায়, সে সম্পত্তিতে স্বত্ব হারায় না (গিরিশের নজির)। নকনা সম্পত্তিতে স্বত্ব হারাইবে যদি সে চ্রা ও নকচির বর্গের আহবান  সত্ত্বেও পিতাকে ভরণ-পোষণ করিতে ফিরিয়া না যায়। পিতার অত্যাচার সহ্যের অতীত হইলে নকনা পৃথক হইবার দাবি পেশ করিতে পারে। তখন বৈঠক আহবান করিয়া তাহাদের পৃথক করা হইবে। তবে নকনার সম্পত্তি স্বত্ব বজায় থাকিবে।

৭. নিজেদের কন্যা না থাকায় মাতাপিতা নকনারূপে পোষ্যকন্যা গ্রহণ করিতে চাহিলে তাহারা প্রথম পত্নীর মাচং হইতে পোষ্যকন্যা চাহিবে। পত্নীর মাচং কন্যা দিতে না পারিলে, তাহারা বৈঠক ও ভোজের ব্যবস্থা করিয়া একজনকে পোষ্যকন্যা মনোনয়ন করিয়া লইবে। এই ক্ষেত্রে মনোনীত কন্যা যে কোন মাচং এর হইতে পারে। কিন্তু কন্যাকে হইতে হইবে পোষ্য গ্রহণকারিণীর সগোত্রীয়া। পোষ্য গ্রহণকারিণী সাংমা বা মারাক হইলে কন্যাকেও হইতে হইবে সাংমা বা মারাক।

৮. যে পুরুষ নকনাকে বিবাহ করে, কার্যতঃ সেইই নক্রম হয়। যদি নকনার গর্ভে ঐ পুরুষের কন্যা হয়, নকনার মৃত্যুর পর এই কন্যা মাতৃ-সম্পত্তির আইনসংগত উত্তরাধিকারিণী হয়। যদি নক্রম মৃতা পত্নীর সগোত্রা দ্বিতীয়া পত্নী গ্রহণ করে, প্রথমা পত্নীর কন্যা বর্তমান থাকত দ্বিতীয় পত্নী উক্ত সম্পত্তির অধিকার পাইতে পারে না। উক্ত সম্পত্তি পরবর্তীকালে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইলে, বর্ধিত সম্পত্তির অধিকারিণী প্রথমা পত্নীর কন্যাই হবে।

নক্রমকে শ্বশুরের সগোত্র হইতে হইবে। এই নিয়ম বিশেষত খ্রিষ্টানদের দ্বারা কড়াকড়িভাবে পালিত হয় না। বিশেষত পিতার পক্ষে তাহার কন্যার জন্য তাহার আপন ভগ্নির নিকট হইতে উপযুক্ত জামাতা পাওয়া খুবই কঠিন হইতে অন্য মাচং হইতে সে শিক্ষিত ও রুচিসম্মত জামাতা গ্রহণ করিয়া থাকে। তখন এই জামাতা যে কোন সক্রমের মাচংয়ের হউক, পরিবার ও চ্রাবর্গের সম্মতিক্রমে নক্রমরূপে গৃহীত হয় ও নক্রমের সমস্ত অধিকারই সে লাভ করে। এই স্বীকৃতি সম্বন্ধে গারোদের মধ্যে অজ্ঞতাবশত নকনা ও নক্রমের উপর বহুবার অন্যায় বিচার হইয়া গিয়াছে, তৎকালে উভয়ই অন্যায়ভাবে উত্তরাধিকার হইতে বঞ্চিত হইয়াছে।

৯. উপরোক্ত ক্ষেত্রে, নকনা যদি কন্যা রাখিয়া মরিয়া যায়, কন্যা নাবালিকা থাকাকালে পিতা তাহার অভিভাবক হইতে পারে। পিতা মৃতা পত্নীর মাচংয়ের বাহিরে অন্য পত্নী গ্রহণ করিলে, পিতা অথবা তাহার দ্বিতীয়া পত্নী কেহই সম্পত্তির অধিকার পাইবে না (আলিম রেমা)। মৃতা পত্নীর চাচ্চিবর্গ কিছু দান করিয়া থাকিলে, তাহা তাহাদের হইবে (দ্রষ্টব্য-১২)।

১০. পরিবারের মধ্যে তিন কন্যা থাকিলে যদি একজন নকনা হয় এবং অন্য দুইজন বিবাহিতা হইয়া অন্যত্র বাস করে, তবে প্রত্যেকের কি প্রকার সন্তান হয় তদনুযায়ী উত্তরাধিকার স্বত্ব নির্ধারিত হয়।

নকনা কোন কন্যা না রাখিয়া মারা গেলে, তাহার ভগ্নীগণ বা ভগ্নী কন্যাগণ তাহার সম্পত্তি দাবি করিতে পারে না। অপরপক্ষে, নকনার পরিবার ও কন্যা থাকিলে যদি তাহার ভগ্নীগণ সন্তানহীনা হয় এবং অন্য কোন নিকটতমা আত্মীয়া না থাকে, তবে নকনা নিজের জন্য বা নিজ কন্যাদের জন্য তাহার ভগ্নীগণের সম্পত্তি দাবি করিতে পারে। কিন্তু ভগ্নীদ্বয়ের একজন সন্তানহীনা হইলে তাহার সম্পত্তি তৃতীয়া ভগ্নী দাবি করিতে পারে, তখন নকনা তাহা দাবি করিতে পারে না (জয়নাথ কুবি)।

১১. বিপত্নীর পিতা তাহার পুত্র কন্যাগণের অভিভাবক হইবে। যদি সে স্বেচ্ছায় তাহার মৃতা পত্নীর মাচং বহির্ভূত পত্নী গ্রহণ করে, তবে সাধারণত মৃতা পত্নীর ভগ্নি বা নিকটতমা আত্মীয়া নাবালক বা নাবালিকাদের অভিভাবিকা হয়; এবং তাহাদের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিরও অভিভাবিকা হয়। তদপুরি, নাবালিক উত্তরাধিকারিণী বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তাহার সম্পত্তিও ঐ অভিভাবিকা নিজের দখলে রাখিতে পারে (নিম্নে দ্রষ্টব্য)।

১২. কোন পুরুষ স্বেচ্ছায় মৃতা পত্নীর মাচং বহিভর্‚ত পত্নী বিবাহ করিলে তাহারা কেহই মৃতা পত্নীর সম্পত্তি দাবি করিতে পারে না। তাহার ঐ সম্পত্তি হইতে বিতাড়িত হইতেও পারে। প্রথা এই যে, মৃতা পত্নীর চাচ্চিবর্গ একই গোত্র বা মাচং হইতে নূতন পত্নীর বিপত্নীকে দিবে; অথবা তাহারা জটিলতা বর্জন করিবার উদ্দেশ্যে বিপত্নীকে তাহার প্রস্তাবিত পত্নী অন্য গোত্র হইতেও গ্রহণ করিতে দেয়।

১৩. দ্বিতীয় পত্নী বিপত্নীকের সঙ্গে বিবাহে সম্মতিদানের পূর্বে প্রথমা পত্নীর সম্পত্তির অংশ বা প্রথমা পত্নীর কন্যাগণের সম্পত্তির অংশ হইতে পারে। সম্পূর্ণরূপে চ্রাবর্গের ইচ্ছানুসারে তাহার দাবি মীমাংসা হইবে। সম্পত্তির অংশ দেওয়া না হইলে বিবাহে অসম্মত হইতে পারে। দ্বিতীয় বিবাহের পূর্বে যাহা কিছু সম্পত্তি অর্জিত হইয়াছে তাহা দ্বিতীয় পত্নী দাবি করিতে পারে না। যদি প্রথম বিবাহের সন্তানগণ থাকে, দ্বিতীয় বিবাহের পরে অর্জিত সম্পত্তিও দ্বিতীয়া পত্নী দাবি করিতে পারে না।

প্রথম বিবাহের যদি নাবালিকা হয়; এবং সাবালিকা হইলেও যদি পৃথক বাস না করে, সমস্ত ভ‚মিই তখন কন্যারই যৌথ সম্পত্তি বলিয়া বিবেচিত হইবে। একান্নবর্তী পরিবার হইয়া বাস করিলে প্রথম বিবাহের কন্যাগণ পিতার দ্বিতীয় বিবাহের পূর্বে ও পরে অর্জিত সমস্ত সম্পত্তিই দাবি করিতে পারে। দ্বিতীয়া পত্নীকে যে অংশ দান করা হইল তাহা কিন্তু তাহারা দাবি করিতে পারে না।

প্রথম বিবাহের কন্যাগণ যদি স্বেচ্ছায় উদ্যোগী হইয়া বাড়ি হইতে স্বতন্ত্র বাস করে তাহারা দ্বিতীয়া পত্নী দেওয়া সম্পত্তি দাবি করিতে পারে না। তখন ঐ সম্পত্তি দ্বিতীয়া পত্নীরই থাকিবে। অপর পক্ষে, সৎ মাতাই যদি স্বতন্ত্র বাস করিতে স্থির করে; তবে কন্যাগণ সমস্ত সম্পত্তিই দাবি করিতে পারে, দ্বিতীয়া পত্নীর সম্পত্তির কোন অংশই পাইবে না।

উপরিদত্তা (অন’চাপা) বিবাহের ক্ষেত্রে যখন পুরুষ স্ত্রীর সহোদরাকে বিবাহ করে (যাহা অত্যন্ত বিরল) তখন একান্নবর্তী পরিবার যতদিন থাকে এবং কাহারও কোন কন্যা না থাকে, উভয় ভগ্নীরই সম্পত্তির উপর সম্পূর্ণ দাবি থাকিবে। পুরুষ যদি বুদ্ধা স্ত্রীলোক ও তাহার কন্যা উভয়কেই বিবাহ করে, যখন ঐ বৃদ্ধা মাতা মরিয়া যায় বা পৃথক হইয়া যায়, কেবল তখন ঐ কন্যা ঐ সম্পত্তি পাইবে।

১৪. বিপত্নীক যদি বিধবা বিবাহ করে, বিধবার যদি কন্যা থাকে, এই কন্যা কেবল তাহার মাতার সম্পত্তি (মাতার মৃত্যুর পর) দাবি করিতে পারে। কিন্তু সে সৎপিতার পূর্ব পত্নীর অধিকারগত সম্পত্তি দাবি করিতে পারে না। এই কন্যা তাহার মাতার বিবাহের পরে অর্জিত সম্পত্তিও দাবি করিতে পারে না, তাহা সে দাবি করিতে পারে যদি একান্নবতী পরিবারভুক্ত হইয়া তাহার সৎপিতা ও দ্বিতীয় বিবাহজাত কন্যাগণের সংগে বাস করে।

১৫. পুত্র ও কন্যাগণের বিবাহ না হওয়া পর্যন্ত তাহাদের ভরণপোষণ করা সম্পূর্ণরূপে মাতার দায়িত্ব। পুত্র ও কন্যাগণ বাড়ি হইতে বিতাড়িত হইলে বা চলিয়া গেলে, যখন ঋণদাতা তাহাদের লওয়া ঋণের টাকা দাবি করে অবস্থা বুঝিয়া মাতা, না হয় মানকবর্গ বা চাচ্চিবর্গ তাহা শোধ করিবে।

১৬. মাতা-পিতা যদি মরিয়া যায় বা পুত্র-কন্যাদের ত্যাগ করিয়া চলিয়া যায়, মাতার নিকটতমা আত্মীয়া ঐ সন্তানদের পালন করিবে। বিপত্নীককে তাহার মৃত্যু বা বিবাহ না হওয়া পর্যন্ত তাহার পত্নীর ভগ্নী বা এইরূপ ভগ্নী না থাকিলে তাহার পত্নীর নিকটতমা আত্মীয়ার ভরণপোষণ করিতে বাধ্য। বিপত্নীকের সাবালিকা কন্যা থাকিলে, এই কন্যাই উক্ত দায়িত্ব বহন করিবে।

বিপত্নীক নক্রমকে ভরণপোষণ করিতে যদিও তাহার শ্যালিকা বাধ্য, তবু এই প্রকারের ভরণপোষণ দাবি করা নক্রমের পক্ষে রীতি সম্মত নহে। বাড়ি ত্যাগ করিয়া যাওয়াই তাহার পক্ষে সাধারণ রীতি।

১৭. কোন লোকের তিন কন্যা থাকিলে, সমস্ত সম্পত্তির উপর নকনার দাবিই প্রথম। অন্য দুইজনের একজন যদি পিতার সগোত্র বিবাহ করে, কিন্তু বধূ হইয়া চলিয়া যায়, সে মাতৃ সম্পত্তির অধিকার হারায়। তৃতীয়া কন্যা যদি বধূ হইয়া না যায়, কিন্তু পিতার অগোত্র বিবাহ করে, তখন নকনার মৃত্যু হইলে মাতৃ-সম্পত্তির উপর তৃতীয়া কন্যার দাবি দ্বিতীয়া কন্যার অপেক্ষা অধিক বলবৎ হইবে। এমনকি সে পৃথক হইয়া থাকিলেও তাহার দাবি সমান বলবৎ থাকিবে।

১৮. পত্নী যদি পুত্র কন্যা রাখিয়া মারা যায়, এবং বিপত্নীক মৃতা পত্নীর আত্মীয় বর্গের সংগে পরামর্শ না করিয়াই সে যদি মৃতা পত্নীর অগোত্রা পত্নীর বিবাহ করে, তবে মৃতা পত্নীর আত্মীয়বর্গ তাহাকে ও তাহার দ্বিতীয়া পত্নীকে তাড়াইয়া দিতে পারে, এবং মৃতা পত্নীর নিকটতমা আত্মীয়া সাধারণত তাহার ভগ্নী ঐ পুত্র কন্যাদের হইয়া তাহাদের মাতৃ সম্পত্তি অধিকার করিতে পারে।

১৯. মাতার মৃত্যুর পর কন্যা পিতাকে ভরণপোষণ করিতে অস্বীকার করিলে, কন্যা পিতাকে সম্পত্তির অংশ দিয়া তাহার জীবিকার উপায় করিয়া দিবে। কিন্তু সে যদি আবার বিবাহ করে, বা পৃথক হইয়া যায়, কন্যা সমস্ত সম্পত্তি দাবি করিতে পারে।

২০. পুত্রগণ মাতার ভরণপোষণ করিয়া থাকিলে, মাতা, চ্রা ও নকচিক বর্গের সম্মতি লইয়া অর্ধেক সম্পত্তি পারিশ্রমিক হিসাবে পুত্রগণকে দিতে পারে। কিন্তু তাহারা এই সম্পত্তির স্বত্ব অর্জন করে না। বিবাহিত হইলে ইহার ভোগাধিকার হারায়।

২১. চ্রা ও নক্চিক বর্গ মাতার সম্মতি ছাড়া তাহার সম্পত্তি তাহার পুত্রগণকে দিতে পারে না, কারণ তাহা হইলে সম্পত্তি মাচংয়ের বাহিরে চলিয়া যাইবে।

অবস্থা বিশেষে প্রয়োজন হইলে, সমবেত চ্রা বর্গ পরিবারের কন্যাগণের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করিয়া দিবার অধিকার রাখে। মাতা বা অন্য আইনসংগত উত্তরাধিকারিণী মৃতা হউক বা জীবিত থাকুক এই আইন বলবৎ হয়, যখন জড়বুদ্ধি হওয়াবশত বা অন্য কোন গুরুতর অক্ষমতাবশত মাতা বা উত্তরাধিকারিণীর পক্ষে সম্পত্তিদান সম্ভবপর হয় না।

২২. পুত্র যদি পিতার অসগোত্র পত্নী গ্রহণ করে, (মনে করুন, পুত্র ম্রং ও পুত্রবধূ রেমা) ওই পুত্রবধূ যদি বৌ আসে, মনে করা হইবে ম্রং সম্পত্তি রেমা মাচংয়ের হাতে চলিয়া যাইবে। কিন্তু গারো আইন তাহা হইতে দিবে না।

ঐ সম্পত্তি প্রকৃতপক্ষে ‘নক’ হিসাবে রেমাবে হাতে আছে এবং তাহা ঐ বিবাহজাত পুত্রের ভাবী বধূর অধিকারে আসিবে। অর্থাৎ ঐ পুত্রকে ম্রং পিতামহীর ম্রং পত্নী গ্রহণ করিতে হইবে এবং এই বধূকে ঐ বাড়ীতে বৌ আসিতে হইবে। তখন ম্রং সম্পত্তি ম্রং- এর হাতে ফিরিয়া আসিবে। ম্রং-রেমার বিবাহের কন্যাগণ ঐ সম্পত্তি দাবি করিতে পারে না। যদি পৌত্রবধূ অপেক্ষা বা পুত্রবধূ অপেক্ষা বা পিতৃপত্নী অপেক্ষা নিকটতর দাবিদার থাকে, সে ঐ সম্পত্তি দাবি করিতে পারে। (এইরূপ ঘটনা অত্যন্ত বিরল, যেহেতু তাহা জটিলতার সৃষ্টি করে)।

২৩. আ‘ত্তং এবং দোয়ালদের মধ্যে কন্যা পিতাকে বা ভাইকে পালন করিতে না চাহিলে তাহাকে তাড়াইয়া দিতে পারে। কিন্তু আবেংদের মধ্যে এইভাবে পিতা বা ভাইকে তাড়াইয়া দেওয়া হয় না।

গারো শব্দগুলোর অর্থঃ

মাচং = গোষ্ঠী বা গোত্র।

চ্রাং = মাতৃ গোত্রের পুরুষ লোকগণ।

নক্চিক = মাতৃ গোত্রের স্ত্রী লোকগণ ও তাহাদের স্বামীগণ।

মা’নক = পুরুষের মাত্র গোত্রের স্ত্রীলোকগণ।

চাচ্ছি = মাতৃ গোত্রের পুরুষ ও স্ত্রীলোকগণ এবং স্ত্রীলোকগণ স্বামীগণ।

খিম্ = বৈবাহিক চুক্তিজনিত যে বাধ্যবাধকতা উভয় পক্ষের উপর এবং উভয় পক্ষের আত্মীয় ও আত্মীয়া বর্গের উপর বর্তায়, তাহাই “খিম্” লঙ্ঘন করিলে ৬০ (ষাট) টাকা জরিমানা দিতে হয়।

গ্রো = জরিমানা। যে সমস্ত গ্রো দেওয়া হয় না ঐগুলির হিসাব রক্ষা করিয়া থাকে।

রেফারেন্সঃ জানিরা সংকলনঃ দ্বিতীয় খন্ড, জুন ২০১৫ খ্রিস্টাব্দ।

আরো পড়ুনঃ

Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
Disqus ( )
error: Content is Copywrite!