garo wangala dancegaro wangala danceWanna folk Dance

গারো উত্তরাধিকার আইন পর্যালোচনাঃ পুরুষের স্বোপার্জিত সম্পত্তি

গারো জাতি যখন তিব্বত এবং আসাম থেকে দলে দলে এসে গারোহিলস অঞ্চলে বসতি স্থাপন করতে থাকল তখন গারোহিলস ভূমি তাঁরা বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিল। গারো গোত্রগুলি ছিল মাতৃগোত্র। এই মাতৃগোত্রকেই বলা হয় মাহারি। প্রত্যেক মাহারির জন্য সীমা নির্ধারিত করে দেওয়া অঞ্চলকে বলা হত ‘আখিং’। মিষ্টার জবাং ডি. মারাক তাঁর “The Garo Law”

গারো উত্তরাধিকার আইন পর্যালোচনাঃ পুরুষের স্বোপার্জিত সম্পত্তি

রেভাঃ ক্লেমেন্ট রিছিল

গারো পুরুষের স্বোপার্জিত সম্পত্তি নিয়ে এই ক্ষুদ্র নিবন্ধ আমি লিখছি আমাদের দেশের আদালতের রায়গুলিকে ভিত্তি করে। আমি যতদূর বুঝতে পেরেছি আমাদের দেশের আদালতই প্রথম বুঝিয়ে দিল যে এই গারো প্রথা বা আইন পূর্ব থেকেই স্বোপার্জিত সম্পত্তির উপর গারো পুরুষের স্বত্বাধিকার আছে।

২. গারো জাতি যখন তিব্বত এবং আসাম থেকে দলে দলে এসে গারো হিলস অঞ্চলে বসতি স্থাপন করতে থাকল তখন গারো হিলস ভূমি তাঁরা বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিল। গারো গোত্রগুলি ছিল মাতৃগোত্র। এই মাতৃগোত্রকেই বলা হয় মাহারি। প্রত্যেক মাহারির জন্য সীমা নির্ধারিত করে দেওয়া অঞ্চলকে বলা হত ‘আখিং’। মিস্টার জবাং ডি. মারাক তাঁর “The Garo Law” এর ৭৮ নং ধারায় আ.খিং ভূমির শ্রেণী বিভাগ করে দিয়েছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী চার শ্রেণীর ‘আ.খিং’ ভূমি আছে।

প্রথম শ্রেণীর আ.খিংকে বলা হত ‘আ.জোমা। ‘আ’ মানে ভূমি এবং ‘জোম’ মানে এজমালি। এই প্রকারের আ.খিং হল একটা গোটা মাহারির এজমালি ভূমি এবং একজন নকনা মেচিক ও নক্রমের স্বত্বাধিকৃত থাকত। ঐ মাহারির বিভিন্ন পরিবার ঐ ‘আ.খিং’-এর মধ্যে নিজ নিজ অংশ ভোগ করত।

দ্বিতীয় শ্রেণীর আখিংকে বলা হত ‘আ.জিকসি’। ‘জিকসি’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘দম্পতি’। এই প্রকারের আ.খিং নকনার মাহারি ও নক্রমের মাহারি এই উভয় মাহারির যুক্ত স্বত্বাধিকারভুক্ত।

তৃতীয় শ্রেণীর আখিংকে বলা হত ‘আ.মাৎথে’। এই আ.মাৎসে হল একটা আ.খিং এর এমন অংশ যা অন্য এক ব্যক্তি বা মাহারি ক্রয় করে নিয়েছে কিন্তু ক্রয় করার পরও মূল আখিং এরই অন্তর্ভুক্ত থেকে গেছে।

চতুর্থ শ্রেণীর আখিংকে বলা হত ‘আ.মিল্লাম’। ‘মিল্লাম’ শব্দের অর্ত হচ্ছে তরবারি। আ.মিল্লাহ হচ্ছে তরবারি দ্বারা অধিকৃত জমি। মাহারির সঙ্গে মাহারি যুদ্ধ করত, গ্রামের সঙ্গে গ্রামের যুদ্ধ বাধত। এইরূপ যুদ্ধের মাধ্যমে যে ভূমি অধিকার করা হতো তাকেই বলা হতো ‘আ.মিল্লাম’। আ.মিল্লামও কোন এক মাহারির বা দুই মাহারির এজমালি সম্পত্তি বলে গণ্য করা হতো। তাহলে আমরা বুঝতে পারছি আ.খিং ছিল মাহারি সম্পত্তি। অধিকাংশ গারো সমাজ আ.খিং ভূমি বা মাহারি সম্পত্তিই ভোগ করত। কাজেই এমন সমাজে স্বোপার্জিত সম্পত্তি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিরল হয়ে এসেছিল। গারোহিলসের গারো সমাজ স্বোপার্জিত সম্পত্তি ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিরল হয়ে এসেছিল। গারোহিলদের গারো সমাজ স্বোপার্জিত সম্পত্তির ধারণা ভুলে যেতে আরম্ভ করেছিল। ক্রমে ক্রমে তাদের মনের মধ্যে এই ভ্রান্ত ধারণাই বদ্ধমূল হতে লাগল যে গারো পুরুষের স্বত্বাধিকারে কোন সম্পত্তিই থাকতে পারে না। এই ধারণা প্রভাবিত যে প্রথা গারো সমাজে প্রচলিত পাওয়া গিয়েছিল সেইটাকেই মি. জবাং ডি. মারাক ও রেভাঃ সি. ডি. বলডুইন আইন সংকলন আকারে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। মি. জবাং ডি. মারাক তাঁর “The Garo Law”–এর প্রথম অধ্যায়ের ১ নং ধারায় লিখেছেন, “মাতৃতান্ত্রিক আইনে গারো পুরুষ সম্পত্তির অধিকারী হতে পারে না।” রেভাঃ সি. ডি. বলডুইন তাঁর “Garo Law”এর প্রথম অধ্যায়ের ১ নং ধারায় লিখেছেন, “গারোদের মধ্যে প্রচলিত মাতৃতন্ত্র অনুযায়ী কোন পুরুষ কোন প্রকার সম্পত্তির অধিকারী হইতে পারে না। পুরুষ সন্তান বয়ঃপ্রাপ্ত হউক বা না হউক, সে যাহা কিছু অর্জন করে বা অন্যের নিকট হইতে লাভ করে, সমস্তই তাহার মাতার বা ভগ্নীদের সম্পত্তি হইবে। বিবাহিত পুরুষ যাহা কিছু অর্জন করে সমস্তই তাহার পত্নীর সম্পত্তি হইবে বা পত্নী বিয়োগ ঘটিয়া থাকিলে তাহার কন্যার সম্পত্তি হইবে”। আমাদের মনে রাখতে হবে গারো সম্পত্তির স্বত্বাধিকার ও উত্তরাধিকার বিষয়ক আইন আজ পর্যন্ত প্রণীত হয়নি। প্রচলিত প্রথাকেই আইনরূপে গণ্য করা হয়ে থাকে। ঐ প্রচলিত প্রথারই লিখিতরূপ হচ্ছে জবাং এর “The Garo Law”। তার মধ্যে আমরা দেখি গারো পুরুষের সম্পত্তি স্বত্বাধিকারকে একেবারে উপেক্ষা করা হয়েছে।

৩. রেভাঃ সি.ডি. বলডুইনের “Garo Law” এবং মি. জবাং ডি. মারাকের “The Garo Law” এবং মেজর এ. প্লেফেয়ারের “The Garos” এই তিনটি গ্রন্থই আমাদের আদালতের আইনজ্ঞ বিচারকগণ পাঠ করেছিলেন এবং মেজর এ. প্লেফেয়ারের “The Garos” কে ভিত্তি করেই তাঁরা রায় দিয়েছিলেন যে, গারো পুরুষের স্বোপার্জিত সম্পত্তির উপর স্বত্বাধিকার আছে। মেজর এ. প্লেফেয়ার ছিলেন ব্রিটিশ শাসনাধীন পূর্ব বাংলা ও আমাদের ডেপুটি কমিশনার। তিনি তাঁর গবেষণালব্ধ তথ্যাদি “The Garos” নামক গ্রন্থের আকারে ১৯০৯ সালে প্রকাশ করেন। ঐ গ্রন্থের ৭১ পৃষ্ঠায় লেখা আছে “ গারো পুরুষ সম্পত্তির স্বত্বাধিকারী হতে পারে যদি সে তা নিজে অর্জন করে থাকে যদিও সে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারে না।”

৪. প্লেফেয়ারের “The Garos” থেকে আমরা তাহলে বুঝতে পারছি ‘আ.খিং’ প্রথা বা মাহারি সম্পত্তি প্রথা প্রচলিত হবার পূর্বে থেকেই পুরুষের সম্পত্তি স্বত্ব ছিল। তা এখন বিস্মৃত বা ঝাপসা হতে পারে কিন্তু নিরাকৃত হতে পারে না। তা যে নিরাকৃত হয়নি তা জবাং এর “The Garo Law”–এর ভূমিকা থেকে আমরা বুঝতে পারি। তিনি ভূমিকার আরম্ভেই বলেছেন, “পাঠকবর্গ যেন গারো উত্তরাধিকার আইন সহজে বুঝিতে পারে, তদুদ্দেশ্যে গারো সম্পত্তির সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিতেছি। গারো সম্পত্তি দুই শ্রেণীভুক্ত। যে সম্পত্তি পুরুষানুক্রমে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত তাহা প্রথম শ্রেণীভুক্ত; এবং যে সম্পত্তি ব্যক্তিবিশেষ তাহার জীবদ্দশায় অর্জন করে তাহা দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত। এই সম্পত্তিকে বলা হয় ‘মানাথাং গামজিন’ অর্থাৎ স্বোপার্জিত সম্পত্তি।” স্বোপার্জিত সম্পত্তি বিষয়ক ধারণা তখনও ছিল বলেই যখন গারোরা বাংলাদেশের সমতল ভূমিতে এসে জঙ্গল ভূমি পরিষ্কারপূর্বক আবাদী জমি করে নিয়েছিল । তখন পুরুষেরা এই সমস্ত জমি নিজেদের নামেই রেকর্ড করিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু বৃটিশ রাজত্বকাল Aboriginal Welfare Board গঠিত হয়েছিল। এই বোর্ডেরই সিদ্ধান্ত ও জোর সুপারিশ অনুযায়ী বাংলাদেশের গারো পুরুষদের স্বত্বাধিকৃত ভূসম্পত্তি সমস্তই তাদের নিজ নিজ স্ত্রীর স্বত্বাধিকৃত করা হল। এই পদক্ষেপ নিশ্চিতই একটা মারাত্মক ভুল ছিল। এই পদক্ষেপ এই ভ্রান্ত ধারণাকেই সমর্থন করল যে, গারো পুরুষের কোনই সম্পত্তি স্বত্ব থাকতে পারে না। এইরূপ ভ্রান্ত ধারণা মৌলিক মানবিক অধিকারগুলিকে লঙ্গন করেছে। কারণ মানুষের জন্মগত মৌলিক অধিকার আছে জীবন ধারণ করবার এবং তার জন্মগত মৌলিক অধিকার আছে জীবন ধারণের জন্য আবশ্যকীয় সম্পত্তি অর্জন করবার। আজ যা হোক আমাদের বাংলাদেশের আদালত স্বোপার্জিত সম্পত্তির উপর গারো পুরুষের স্বত্বাধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই পথ প্রদর্শনের সুযোগ নিয়ে পুরুষ সমাজে নিজ নিজ মর্যাদা ও স্বত্ব ও অধিকার বিষয়ে সজাগ, সচেতন ও সচেষ্ট হয়ে উঠুক, এই লক্ষ্যকে সম্মুখে রেখেই আমি এই নিবন্ধনের মধ্যে আদালতের রায়গুলি আলোচনা করছি।

৫. গারো পুরুষের স্বত্বাধিকার নিয়ে বহু মামলা হয়ে গেছে। যেখানে যেখানে পুরুষের স্বোপার্জিত সম্পত্তি প্রমাণিত হয়েছে, সেখানে তার স্বত্বাধিকারের স্বপক্ষেই রায় দেওয়া হয়েছে। যে দুইটি নজির বলডুইনের “Garo Law” এর অনুবাদের পরিশিষ্টাকারে আমি সংযোজন করেছিলাম, এখানে ঐ রায়গুলির যুক্তিপরম্পরা বুঝতে চেষ্টা করব এবং আলোচনা করব ঐ রায়গুলি গারো স্বোপার্জিত সম্পত্তির উপর ও গারো পুরুষের স্বত্বাধিকারের উপর কি আলোকপাত করে।

  • উল্লিখিত প্রথম মামলার রায় প্রথমে আলোচনা করি। এ মামলার বাদীপক্ষ ছিল নিরদমণি স্কু এবং কুরবালা স্কু। তাদের অভিযোগ ছিল যে ১৯২৬ সনের ২৭শে অক্টোবর ইন্দ্রমণি স্কুর মৃত্যু হয়। ইন্দ্রমণির স্বত্বাধিকৃত জমি এখন তার ভগ্নী নিরদমণি স্কু এবং ভগ্নীকন্যা কুরবালা স্কু পাবে। ঐ জমি এখন ইন্দ্রমণির পুত্র নন্দ স্কুর অধিকারে আছে কিন্তু নন্দ স্কু ঐ জমি পাবে না। আদালতে প্রমাণিত হল যে উক্ত জমি ছিল কানাই গারোর স্বোপার্জিত সম্পত্তি। তার মৃত্যু হয় ১৯২৬ সনের ২৭শে অক্টোবর। তার মৃত্যুর পর ঐ দিনেই তার স্ত্রী ইন্দ্রমণিরও মৃত্যু হয়। আদালতে আরও প্রমাণ হল যে, আপন স্বোপার্জিত সম্পত্তির উপর গারো পুরুষের স্বত্বাধিকার আছে এবং এই স্বত্ব থেকে তার জীবিতকালে তাকে কেউ বঞ্চিত করতে পারে না। অর্থাৎ ঐ স্বত্ব তার মাতা বা ভগ্নী বা স্ত্রী কেউ কেড়ে নিতে পারে না। কাজেই কানাই গারোর স্বেপার্জিত সম্পত্তি তার জীবিতকালে তারই স্বত্বাধিকৃত ছিল এবং তার মৃত্যুর পর ঐ সম্পত্তি তার স্ত্রী স্বত্বাধিকৃত হয়েছিল এবং তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর ঐ সম্পত্তি তার পুত্র নন্দ স্কুর অধিকারভুক্ত হয়। মামলার রায় প্রদত্ত হয়েছিল ৩০ শে সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সন। আইনজ্ঞ বিচারক শৈলেন্দ্র নাথ চ্যাটার্জি বলেছিলেন, কানাই গারোর স্বোপার্জিত সম্পত্তির উত্তরাধিকার স্বাভাবিক নিয়মে নির্ধারিত হবে । অর্থাৎ উক্ত জমি তার স্ত্রীর গর্ভজাত পুত্র নন্দ স্কুর স্বত্বাধিকৃত থাকবে।
  • এই রায়ের বিরুদ্ধে ময়মনসিংহ কোর্টে আপিল করা হয়েছিল। আপিল কোর্ট মুন্সেফি কোর্টের রায়কে বলবৎ রেখে রায় দিয়েছিলেন ৮ই মে ১৯৪০ সন। মান্যবর আইনবিদ বিচারক পি.সি. ঘোষ রায় দান কালে বলেছিলেন, ‘উপস্থিত ক্ষেত্রে কানাই গারো ও তার স্ত্রী ইন্দ্রমণি উভয়েই খ্রিষ্টান ও সমতল বাসিন্দা। তারা পাহাড়িয়া গারো নহে। অনুসন্ধান করতে হবে, সমতলবাসী গারোদের মধ্যে এমন কোন প্রথা বা প্রথাগত আইন আছে কিনা যে স্বামীর স্বোপার্জিত সম্পত্তি স্ত্রী উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হলে উক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকার উক্ত স্ত্রীর গর্ভজাত পুত্রকে বাদ দিয়ে উক্ত স্ত্রীর ভগ্নীর উপর বর্তাবে।” বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষই সাক্ষ্য দিয়েছে যে, কানাই গারোর স্বোপার্জিত সম্পত্তি তার স্ত্রী ইন্দ্রমণির স্বত্বাধিকৃত হয়েছিল। তারপর বাদীপক্ষ বলেছে ইন্দ্রমণির মৃত্যুর পর উক্ত সম্পত্তি তার ভগ্নীর হবে কারণ ভগ্নীই তার নিকটতমা আত্মীয়া। কিন্তু বিবাদী পক্ষ বলেছে ইন্দ্রমণির মৃত্যুর পর উক্ত সম্পত্তি তার পুত্রের হবে কারণ তার কন্যা নেই। কিন্তু প্রত্রই যদি না থাকত তবে উক্ত সম্পত্তি তার ভগ্নীর হত। এতদবিষয়ক গারো আইন যে কি তা জানতে হবে গভর্নমেন্টের নির্দেশে প্রকাশিত পুস্তকগুলি কি বলে তা দেখতে হবে। পূর্ব বাংলা ও আসামের ডেপুটি কমিশনার মেজর এ. প্লেফেয়ার কর্তৃক লিখিত “The Garos” উপস্থাপিত বিষয়ে প্রামাণিক গ্রন্থ। উক্ত গ্রন্থ ১৯০৯ সনে পূর্ব বাংলা ও আসামের গর্ভমেন্টের নির্দেশে প্রকাশিত হয়েছিল। পূর্বাভাবেই লেখক বলেন, “এতদপ্রসঙ্গে পার্বত্য গারোদের কথাই আমি মনে করছি, কারণ সমতল বাসিন্দারা ভিন্ন শ্রেণীর এবং তারা বহু উপজাতীয় বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে।” উক্ত গ্রন্থের ৭১ পৃষ্টায় উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “উত্তরাধিকার আইন সংক্ষেপে এই যে সম্পত্তি একবার মাহারির অন্তর্ভুক্ত হলে তা আর তার বাহিরে যায় না এবং কোন পুরুষ কোন অবস্থাতেই উত্তরাধিকারী হতে পারে না। এখানে জিজ্ঞাস্য এই নয় যে বিবাদী নন্দ স্কু কি উত্তরাধিকার থেকে বাদ যাবে? এখানে জিজ্ঞাস্য হল বাদীপক্ষ নিরদমণি ও কুরবালা কোন প্রথাগত আইন উত্তরাধিকারিণী হতে পারে কিনা। গারো পুরুষের স্বোপার্জিত সম্পত্তি স্ত্রী উত্তরাধিকারী-সূত্রে প্রাপ্ত হলে উক্ত সম্পত্তির ওয়ারিশ কে হবে তদবিষয়ে উক্ত পুস্তকে কিছু নেই। রেভাঃ সি.ভি. বলডুইন কর্তৃক রচিত “Garo Law” পুস্তকও এতদবিষয়ে আলোকপাত করে না। সুতরাং বাদীপক্ষ নিরদমণি ও কুরবালা প্রমাণ করতে পারল না যে সমতলবাসী গারো পুরুষের স্বোপার্জিত সম্পত্তি তার স্ত্রী উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হলে তা তার গর্ভজাত পুত্রকে বাদ দিয়ে তার ভগ্নীর হবে। কারণ তেমন কোন প্রথাগত আইন আমরা অনুসন্ধান করে পেলাম না। কোন মাতৃতন্ত্রের নীতিই বলে না যে পুরুষের স্বোপার্জিত সম্পত্তি তার স্ত্রী উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হলে তা পুরুষের মাতৃগোত্রের বাইরে চলে যায়। উপরন্তু দেখি মেজর এ. প্লেফেয়ার বলেছেন, গারো পুরুষ সম্পত্তির স্বত্বাধিকারী হতে পারে যদিও উত্তরাধিকারী হতে পারে না। তারপর বাদী ও বিবাদী উভয়পক্ষের সাক্ষ্য থেকে বোঝা যায় স্ত্রী উক্ত প্রকার সম্পত্তির ওয়ারিশ হতে পারে। অতএব উক্ত সম্পত্তির পরবর্তী ওয়ারিশ স্বাভাবিক নিয়মেই নির্ধারিত হবে। তাই পূর্ববতী আদালতের বিচার ও রায় বলবৎ রাখা হল।

৬. আমাদের দ্বিতীয় আলোচ্য মামলার বাদীপক্ষ হচ্ছে আপলাবালা স্কু। বাদী পক্ষের অভিযোগ এই যে যজ্ঞমণি স্কুর কনিষ্ঠা কন্যা পুরবালাকে বিবাদী নরেশ চন্দ্র থিগিদী বিবাহ করেছিলেন। সে নিজ মাতার গৃহে তাকে বৌ নিয়ে গিয়েছিল। বিবাহকালে বিবাদী নরেশ চন্দ্রের নিজস্ব সম্পত্তি ছিল না। তার শ্বাশুরি যজ্ঞমণি কন্যা পুরবালাকে ধাইরপাড়া মৌজাভুক্ত ২২৬ নং দাগের জমি কয়েক বৎসরের জন্য নিয়েছিল। পুরবালা উক্ত জমি ছয় বৎসর ভোগ করেছিল। উক্ত জমি পুরবালার স্বত্বাধিকারভুক্ত ছিল। পুরবালা তার ভগ্নিকন্যা আপলাবালাকে পোষ্য কন্যা গ্রহণ করেছিল। পুরবালার মৃত্যু হয়েছে। নরেশ চন্দ্র আপলাবালাকে পোষা তাড়িয়ে দিয়ে উক্ত জমি ভোগ দখল করেছে। উক্ত জমির স্বত্ব ও দখল আপলাবালাকে ফিরিয়ে দেবার জন্য এই মামলা রুজু করা হয়েছে।

বিবাদী নরেশ চন্দ্রের বিবৃত সংক্ষেপে এই তার মাতা বিলাসমণি থিগিদীর পনের একর জমি আছে। বিলাসমণির তিন পুত্র ও তিন কন্যা। দুই পুত্র জামাই গিয়েছে, এবং দুই কন্যা অন্যত্র বৌ গিয়েছে। কেবল এক কন্য শৈবালিনী বিবাহ করে পৈতৃক ভিটাতে বাস করছে, কিন্তু মাতার সহিত একান্নভুক্ত নয়। বৃদ্ধ পিতা রহিম মারাক দশ বারো বৎসর অন্ধত্বে ভুগে সত্তর বৎসর বয়সে মারা গিয়েছে। নরেশই জ্যেষ্ঠ পুত্র হওয়ায় মাতার সঙ্গে আছে এবং মাতার সম্পত্তি দেখাশুনা ও চাষাবাদ করছে। তার মাতা তার জন্য ৯৭ শতাংশ জমি ব্যবস্থা করে দিয়েছে এবং তার মাতার আর্থিক সাহায্যে সে নিজের নামে মামলাকৃত জমিটা ক্রয় করেছে। তার মাতা পুরবালাকে বৌ এনে তার সঙ্গে বিবাহ দিয়েছে। যজ্ঞমণি তার কন্যা পুরবালাকে কখনও কোন জমি ছয় বৎসর ভোগ করতে দেয়নি। নরেশের স্বোপার্জিত সম্পত্তিতে পুরবালা কোন স্বত্ব অর্জন করেনি। গারো প্রথা অনুযায়ী তার স্বোপার্জিত সম্পত্তি তার জীবিতকালে তারই স্বত্বাধিকারে আছে। বিবাদী আরও বলেছে সে আপলাবালাকে কখনও পোষ্য কন্যা গ্রহণ করেনি। আপলাবালা বিবাদীর গৃহে মধ্যে মধ্যে এসে থাকত ও রন্ধনাদি গৃহকর্মে পুরবালাকে সাহায্য করত। মামলাকৃত জমিটার জমিটার উপর বাদীপক্ষের কোন স্বত্ব বা দাবি নেই।

৭. ময়মনসিংহ ৪র্থ কোর্টের মান্যবর আইনবিদ বিচারক এম.এ. চৌধুরী এই মামলার নিষ্পত্তি করেন ২৪শে মে ১৯৬২ সনে। পোষ্যা কন্যা গ্রহণ সম্পর্কে তাঁর রায় ছিল এইরূপ- ফাদার গুলিও কস্তা এস.ডি.বি. কর্তৃক লিখিত “The Garo Code of Law”, মিঃ জবাং ডি মারাক কর্তৃক লিখিত “The Garo Law” এবং রেভাঃ সি.ডি. বলডুইন কর্তৃক লিখিত “Garo Law” এই তিনটি পুস্তকই উল্লেখ করেছে গারো সমাজে কতগুলি আচারের মাধ্যমে পোষ্যা কন্যা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বাদী পক্ষের সাক্ষীগণ বলতে পারল না যে পোষ্যা গ্রহণের অবশ্যপালনীয় আচার, বৈঠক ও ভোজ সম্পন্ন হয়েছিল কিনা। আপলাবালার সাক্ষ্য এই যে বাংলা ১৩৫৬ সালের মাঘ মাসে তাকে পোষ্যা কন্যা গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু তখন পুরবালার বয়স ছিল ২৩ বৎসর এবং বয়স এখনও ৩৮ বৎসর মাত্র। তাহলে ১৩৫৬ সালে নরেশ ও পুরবালা উভয়েরই সন্তান জন্মাবার বয়স ও ক্ষমতা অক্ষুন্ন ছিল। এমতাবস্থায় তাদের পক্ষে পোষ্যা কন্যা গ্রহণের সম্ভাবনা ছিল না। অতএব বাদীপক্ষ প্রমাণ করতে পারল না যে বিবাদী তাকে পোষ্যা কন্যা গ্রহণ করেছিল।

বাদীপক্ষের ১নং সাক্ষী গোপীনাথ আপলাবালার পিতা এবং ৪নং সাক্ষী জ্ঞান মানখিন সাক্ষ্য দিয়েছে যজ্ঞমণি পুরবালাকে ছয় বৎসর ভোগ করতে দিয়েছিল ধাইর পাড়া মৈাজার ২২৬ নং দাগের এক কুড় জমি । কিন্তু ঐ জমির পরিমাণ মাত্র ৭৪ শতাংশ। তারা আরও বলেছে ঐ জমির আয় থেকেই মামলাকৃত জমিটা ক্রয় করা হয়েছে। উক্ত প্রকার সাক্ষ্য দলিল পত্রের প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাসযোগ্য নহে। বিবাদী জমি দানের কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করছে এবং পুরবালা বৌ-রূপে বিবাদীর মাতার গৃহে এসেছিল এবং সেখানেই তার মৃত্যু পর্যন্ত বাস করেছিল। এমতাবস্থায় বাদীপক্ষ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে যে, যজ্ঞমণির জমির আয় থেকে মামলাকৃত জমিটা ক্রয় করা হয়েছিল।

অধিকন্তু দলিলপত্র ও খতিয়ানগুলি প্রমাণ করে যে মামলা জমিটা সমস্তই নরেশের স্বোপার্জিত সম্পত্তি। কাগজপত্র আরও প্রমাণ করে যে তার মাতা বিলাসমণির পনর কি ষোল একর জমি আছে এবং সে বিবাদীকে সম্পত্তি উপার্জনে আর্থিক সাহায্য দান করতে সক্ষম। অতএব প্রমাণিত হচ্ছে যে মামলা জমিটা বিবাদী নরেশের স্বোপার্জিত সম্পত্তি।

৮. এখন প্রশ্ন হচ্ছে বিবাদীকে কি তার জীবিতকালেই তার স্বোপার্জিত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যায়? মেজর এ. প্লেফেয়ার কর্তৃক লিখিত পুস্তকের ৭১ পৃষ্ঠায় লেখা আছে, “গারো পুরুষ সম্পত্তির স্বত্বাধিকারী হতে পারে যদি সে তা নিজে অর্জন করে থাকে, যদিও সে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারে না।” এর অর্থ হচ্ছে এই যে, গারো পুরুষ তার জীবিতকালে তার স্বোপার্জিত সম্পত্তির স্বত্বাধিকারী থাকে, তা তার জীবিতকালে তার মাতা বা ভগ্নী বা স্ত্রীর স্বত্বাধিকারে চলে যায় না। যে তিনটি পুস্তক পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে, ঐগুলি এমন কথা বলে না যে পুরুষের স্বোপার্জিত সম্পত্তি তার জীবিতকালেই তার স্বত্বাধিকারচ্যুত হয়ে অন্যের স্বত্বাধিকৃত হয়।

বাদীপক্ষের সাক্ষী যোগেন্দ্র রেমা বলেছে সে তার পিতার নিকট থেকে সাত একর জমি পেয়েছে । ঐ জমি তার স্বত্বাধিকৃত আছে তার মৃত্যুর পর ঐ জমি তার স্ত্রীর স্বত্বাধিকৃত হবে। বাদীপক্ষের সাক্ষী যোগেন্দ্র রেমা বলেছে, তারা চারি ভাই তাদের কোন ভগ্নী নেই। তারা পিতার সম্পত্তি পেয়েছে। কিন্তু তাদের মাতার ভগ্নী নিরদমণি ও যজ্ঞমণি উক্ত  সম্পত্তি দাবি করে মামলা দায়ের করে ছিল। হাইকোর্ট পর্যন্ত মামলা চলেছিল, কিন্তু বাদীপক্ষ উক্ত মামলায় হেরে গিয়েছিল। তারা সম্পত্তি কেড়ে নিতে পারেনি। তাহলে প্রমাণিত হচ্ছে যে বিবাদী নরেশের স্বোপার্জিত সম্পত্তি তার জীবিতকালে তারই স্বত্বাধিকৃত আছে তা তার স্ত্রীর পুরবালার স্বত্বাধিকৃত হয়নি।

বেঙ্গল অ্যাগ্রি অ্যাক্ট, সিভিল কোর্টস অ্যাক্ট-এর ৩৭ ধারায় নির্দেশ আছে যে, উত্তরাধিকার, বিবাহ, খরচপত্র ও ধর্মীয় প্রথা ইত্যাদি বিষয়ক মামলাদিতে সংশ্লিষ্ট সমাজের ব্যবস্থায় বা জারিকৃত কোন আইনে মীমাংসা পাওয়া না গেলে আদালত ন্যায়ধর্ম, সুবিচার ও বিবেক অনুযায়ী বিবাদ নিষ্পত্তি করবে। কারো সমাজের উত্তরাধিকার, বিবাহ, খরচপত্রাদি বিষয়ক কোন আইন জারিকৃত হয়নি। অতএব, আদালতকে ন্যায়ধর্ম, সুবিচার ও বিবেকের আইন মেনে বিবাদ নিষ্পত্তি করতে হবে। বাস্তবিক আমার বিবেকে ভয়ানক বাঁধে যে গারো পুরুষ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সম্পত্তি অর্জন করবে আর তার জীবিতকালেই তাকে বঞ্চিত করে তার মাতা বা ভগ্নী বা স্ত্রী উক্ত সম্পত্তি অধিকার করবে । আবার এদের কোন উত্তরাধিকারিণী উক্ত সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে ভোগ দখল করবে । কোন সমাজেরই এরূপ অবস্থার কথা আমি মেনে নিতে পারি না।

অতএব আমার অভিমত এই যে নরেশের স্বোপার্জিত সম্পত্তি তার জীবিতকালে তারই স্বত্বাধিকৃত আছে, তা তার স্ত্রী পুরবালার স্বত্বাধিকৃত হয়নি। অতএব, বাস্তবিকই পোষ্যাকন্যা হয়ে থাকলেও উক্ত সম্পত্তিতে বাদীপক্ষের কোন স্বত্ব বা দাবী থাকতে পারে না।

৯. উপরোক্ত রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছিল ময়মনসিংহ আপিল কোর্টে। ৭ই মার্চ ১৯৬৩ সনে উক্ত কোর্টের মান্যবর আইনবিদ বিচারক এম. ইউসুফ পূর্ববর্তী বিচার ও রায় বলবৎ রেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমি আইনজ্ঞ মুন্সেফের সঙ্গে একমত যে, গারো পুরুষ সম্পত্তি অর্জন করে তার স্ত্রী ও আত্মীয়াদের জন্যই যেমন মাতা, ভগ্নী বা স্ত্রীর জন্য যদিও শেষোক্ত জনেরই অগ্রাধিকার থাকে কিন্তু তার জীবিতকালে সে তার স্বোপার্জিত সম্পত্তির স্বত্বাধিকার অক্ষুন্ন রাখে। আমার অভিমত এই যে আপলাবালাকে যদি বাস্তবিকই পোষ্যা কন্যা গ্রহণ করা হত, তবে পুরবালার মৃত্যুর  পর সে উক্ত মামলা জমির উপর উত্তরাধিকারিণীর স্বত্ব অর্জন করত এবং বিবাদীর মৃত্যুর পর উক্ত সম্পত্তি অধিকার করত।

১০. আমরা উপরোক্ত রায়গুলোর আলোচনার মধ্য দিয়ে দেখেছি যে গারো পুরুষের স্বোপার্জিত সম্পত্তির বিষয়ে কোন উল্লেখই জবাং ও বলডুইনের আইন সংকলনের মধ্যে নেই। তাঁরা শুধু মাহারি সম্পত্তি বিষয়ক আইন সংকলিত করেছেন। উপরুক্ত আলোচনা কালে এটাই পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে, স্বোপার্জিত সম্পত্তির উপর গারো পুরুষের স্বত্বাধিকার আছে। এখন আমাদের আলোচনার আলোকে এবং আমাদের বিবেকের আইন মেনে নিয়ে আমি গারো পুরুষের সম্পত্তি বিষয়ক কতকগুলি ধারা উপস্থিত করব।

১১. গারো পুরুষের স্বোপার্জিত সম্পত্তি বিষয়ক আইন:

১নং ধারা- স্বোপার্জিত সম্পত্তির উপর গারো পুরুষের স্বত্বাধিকার আছে।

২নং ধারা- স্বোপার্জিত সম্পত্তির উপর পুরুষের স্বত্বাধিকার গারো মাহারি সম্পত্তি বিষয়ক আইনের আওতায় পড়ে না।

৩নং ধারা- স্বোপার্জিত সম্পত্তির উপর পুরুষের স্বত্বাধিকার তার জীবিতকালে তার মাতা বা ভগ্নী উপর বর্তায় না অর্থা পুরুষের স্বোপার্জিত সম্পত্তি তার জীবিতকালে তার মাতা বা ভগ্নী বা স্ত্রী কেড়ে নিতে পারে না।

৪নং ধারা-স্বামীর মৃত্যুর পর তার স্বোপার্জিত সম্পত্তি তার স্ত্রীর স্বত্বাধিকার গত হবে।

৫নং ধারা- গারো পুরুষের স্বোপার্জিত সম্পত্তির উত্তরাধিকার স্বাভাবিক নিয়মে নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ স্বামীর স্বোপার্জিত সম্পত্তি স্ত্রী উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হলে স্ত্রী গর্ভজাত পুত্র-কন্যা উক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে, কন্যা না থাকলেও পুত্র থাকলে উত্ত সম্পত্তি স্ত্রীর মাতা বা ভগ্নী বা ভগ্নীকন্যা পাবে না।

৬নং ধারা- গারো পুরুষ অবিবাহিত হয়ে থাকলে তার মৃত্যুর পর তার স্বোপার্জিত সম্পত্তি তার মাতার হবে। মাতা না থাকলে তার সহোদরা ভগ্নীর বা এই ভগ্নীর কন্যার হবে।

৭নং ধারা- বিবাহিত গারো পুরুষ ও তার স্ত্রী, উভয়েরই মৃত্যু হলে যদি স্ত্রীর গর্ভজাত কোন সন্তান না থাকে তাহলে তার স্বোপার্জিত সম্পত্তি তার স্ত্রীর নিকটতমা আত্মীয়ার স্বত্বাধিকার গত হবে।

৮নং ধারা- স্বোপার্জিত সম্পত্তি বলতে স্থাবর এবং স্থাবর উভয় প্রকার সম্পত্তিকেই বুঝতে হবে। স্থাবর সম্পত্তি হচ্ছে যেমন ভূমি, বৃক্ষাদি, গৃহাদি। অস্থাবর সম্পত্তি হচ্ছে যেমন গৃহপালিত পশুপক্ষী, আসবাবপত্র, সঞ্চিত অর্থ উপভোগ্য পণ্যাদি।

৯নং ধারা- গারো পুরুষ সাফ-কাওলার মাধ্যমে সে ভূসম্পত্তি অর্জন করতে পারে।

১১নং ধারা- বয়ঃপ্রাপ্ত গারো পুরুষ যখন চাকরি করবে বা ব্যবসা করবে বা দোকান খুলবে বা শিল্প কারখানা খুলবে, এইভাবে সে যা উপার্জন করবে ও সম্পত্তি গঠন করবে তা তার ব্যক্তিগত স্বত্বাধিকৃত সম্পত্তি হবে।

১২নং ধারা- মাতাপিতা যদি কিছু পরিমাণ ভূমি ভোগ করতে দেয়, তাহলে এই ভ‚মি সে যতদিন ভোগ করবে ততদিন ঐ ভ‚মির আয় তার স্বোপার্জিত সম্পত্তি হবে।

১৩নং ধারা- বয়ঃপ্রাপ্ত গারো পুরুষ বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত হোক, উপরি উক্ত চারি উপায়ে সে স্বোপার্জিত সম্পত্তি অর্জন করতে পারবে।

১৪নং ধারা- অবিবাহিত অবস্থায় সে উপরিউক্ত উপায়গুলোতে যে সম্পত্তি অর্জন করবে তা বিবাহিত অবস্থায়ও তার স্বত্বাধিকারগত থাকবে।

১৫নং ধারা- বিবাহকালে স্বামী-স্ত্রী উপহাররূপে বা দানরূপে যা কিছু লাভ করবে তা তাদের যৌথ স্বোপার্জিত সম্পত্তি হবে।

১৬নং ধারা- বিবাহিত অবস্থায় সে যে সম্পত্তি সাফ-কাওলার মাধ্যমে বা দানপত্রের মাধ্যমে অর্জন করবে তা তার স্বত্বাধিকার গত হবে।

১৭নং ধারা- বিবাহিত অবস্থায় চাকরি দ্বারা বা ব্যবসা দ্বারা বা দোকান দ্বারা বা শিল্প কারখানার দ্বারা গারো পুরুষ যা কিছু অর্জন করবে সমস্তই তার স্বোপার্জিত সম্পত্তি হবে।

১৮নং ধারা- বিবাহিত অবস্থায় চাকরি দ্বারা বা ব্যবসা দ্বারা বা দোকান দ্বারা বা শিল্প কারখানার দ্বারা গারো পুরুষ যা কিছু অর্জন করবে সমস্তই তার স্বোপার্জিত সম্পত্তি হবে।

১২. ১৯৫৪ সনে প্রকাশিত Anthropos জার্নালের ৪৯ খন্ডে “The Garo Code of Law” নিবন্ধে ফাদার গুলিও কস্তা এসডিবি লিখেছিলেন-

স্বামী তার জীবিতকালে যা কিছু সম্পত্তি অর্জন করে পারিবারিক মূলধন দ্বারা ব্যবসা করেই হোক বা নিজের ব্যক্তিগত পরিশ্রমের দ্বারাই হোক বা যা কিছু সে দান বা পুরষ্কাররূপে গ্রহণ করে সমস্তই স্ত্রীর সম্পূর্ণ অধিকারভুক্ত হয়। অতএব, পুরুষের সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক মাত্র বলা যায়। কার্যতঃ স্ত্রীই হচ্ছে গৃহের কর্ত্রী, পরিবার ও গৃহের সমস্ত বিষয় সম্পত্তির অভিভাবিকা ও রক্ষিকা। স্ত্রী তার আনীত সম্পত্তির পূর্ণ অধিকারিণর এবং বিবাহ দিনে যা কিছু স্বামীর অধিকারভুক্ত ও পরবর্তীকালে যা কিছু স্বামী অর্জন করে সেই সকলের ও অধিকারিণী স্ত্রীই। স্বামীকে অবশ্য পূর্ববর্তী অংশের যুক্ত অধিকারী বলা যায়।

১৩. ফাদার গুলিও কস্তা উপরি উক্ত বর্ণনা দ্বারা এমন গারো সমাজের চিত্র এঁকেছেন যা সম্পূর্ণরূপে পুরুষ সম্পত্তি বর্জিত ও পুরুষ স্বত্ব বর্জিত। যে সমাজের মধ্যে আছে শুধু মাহারি সম্পত্তি ও মাহারিস্বত্ব। কিন্তু বাংলাদেশের গারো সমাজে সত্যিকার মাহারি সম্পত্তি নেই, আখিং ভূমি নেই। এই সমাজে আছে ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং সমস্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি পুরুষের পরিশ্রম দ্বারা অর্জিত ও রক্ষিত হয়ে এসেছে। অতএব, ফাদার গুলিও কস্তা যে সম্পত্তি আইনের কথা বলেছেন তা যদি বাংলাদেশের গারো সমাজের উপর প্রয়োগ করা হয় তাহলে পুরুষ সমাজের মৌলিক অধিকারগুলোকে অস্বীকার করা হবে, পুরুষ সমাজের প্রতি গুরুতর অন্যায় করা হবে। কাজেই ফাদার গুলিও যা লিখেছেন তা পরিবর্তিত সংশোধিত করে নিয়ে এখানকার গারো সমাজ সম্পর্কে এইভাবে লিখতে হবে:

“স্বামী তার জীবিতকালে যা কিছু সম্পত্তি অর্জন করে, পারিবারিক মূলধন দ্বারা ব্যবসা করেই হোক বা নিজের ব্যক্তিগত পরিশ্রমের দ্বারাই হোক বা যা কিছু সে দান বা পুরস্কাররূপে গহণ করে, সমস্তই তার স্বোপার্জিত সম্পত্তি হবে, এবং স্ত্রীই তার প্রথম উত্তরাধিকারিণী হবে। এমন কি পুরুষকে তার স্ত্রীর অধিকৃত সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক মাত্র বলা যায় না তাকে বলতে হবে ঐ সম্পত্তির রক্ষাকারী, বৃদ্ধিকারী ও উন্নতিকারী। কার্যতঃ স্বামীই হচ্ছে গৃহের কর্তা, পরিবার ও গৃহের সমস্ত বিষয় সম্পত্তির অভিভাবক ও রক্ষক। স্ত্রী স্বামীর অর্জিত সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী এবং বিবাহ দিনে যা কিছু স্বামীর স্বত্বাধিকারভুক্ত ছিল ও পরবর্তীকালে যা কিছু স্বামী অর্জন করে সেই সকলেরই উত্তরাধিকারিণী স্ত্রী। স্ত্রী সম্পত্তির বৃদ্ধি ও উন্নতির ফলে যে নূতন সম্পত্তি গঠিত হবে স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই তার যুক্ত স্বত্বাধিকারী হবে।”

১৪. পৃথিবীতে যতগুলি উচ্চ সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তার অর্ধেক গড়েছে পুরুষ ও অর্ধেক গড়েছে নারী। গারো সমাজের যেটুকু সভ্যতা ও সম্পত্তি গড়ে উঠেছে তার অর্ধেক অবদান পুরুষের এবং অর্ধেক অবদান নারীর। তাহলে গারো সমাজ পুরুষের এই অবদানকে উপেক্ষিত রেখেছে কেন? পুরুষকে সম্পত্তির ক্ষেত্রে এবং সর্বপ্রকার সামাজিক অধিকারের ক্ষেত্রে বঞ্চিত করা হয়েছে পারিবারিক জীবনের ঐশ্ব প্রদত্ত কর্তৃত্ব থেকে তাকে চ্যুত করা হয়েছে। এটি বিরাট অন্যায় ও বিরাট নির্বুদ্ধিতা। দু’টি ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে অর্থনীতি। একটি হচ্ছে পুরুষের উদ্যম, অপরটি হচ্ছে নারীর উৎসাহ। প্রথমটিই অধিকতর স্থিতিশীল। গারো অর্থনীতি শুধু নারীর ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে। এ ভিত্তি তো দুর্বল। তাই তো গারো সমাজ ও গারো সম্পত্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পুরুষের পূর্ণ উদ্যমের নিয়োগ ব্যতীত এই সমাজ ও সম্পত্তি আর রক্ষা পাবে না। পুরুষের পূর্ণ উদ্যমের নিয়োগ ব্যতীত এই সমাজ ও সম্পত্তি আর রক্ষা পাবে না। তাহলে আত্মরক্ষার জরুরি তাগিদেই পুরুষের প্রতি মারাত্মক অন্যায়ের ত্বরান্বিত সংশোধন গারো সমাজের পক্ষে একান্তই আবশ্যক।

গারো জার্নাল কর্তৃক সম্পাদিত ও পরিমার্জন করে প্রকাশিত।

উৎসঃ জানিরা সংকলনঃ দ্বিতীয় খন্ড, জুন ২০১৫ খ্রিস্টাব্দ।

আরো পড়ুনঃ

Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
Disqus (0 )
error: Content is Copywrite!