garo wangala danceWanna folk Dancegaro wangala dance

গারোদের প্রথাগত সম্পত্তির অধিকার

গারো সমাজের জন্য গারোদের প্রথাগত সম্পত্তির অধিকার বিষয় আমাদের অবশ্যই চিন্তা করতে হবে কারণ ঐ প্রথা গারো সমাজের অর্থনৈতিক জীবনকে প্রচন্ডভাবেই প্রভাবিত করছে।

গারোদের প্রথাগত সম্পত্তির অধিকার

রেভা. ক্লেমেন্ট রিছিল

১. আমরা গারো সমাজের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা ভাবছি, প্রকল্প তৈরি করছি। সত্যিকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন আমরা যদি গারো সমাজের জন্য চাই তবে গারো সম্পত্তি প্রথার বিষয় আমাদের অবশ্যই চিন্তা করতে হবে কারণ ঐ প্রথা গারো সমাজের অর্থনৈতিক জীবনকে প্রচন্ডভাবেই প্রভাবিত করছে। গারো সম্পত্তি বিষয়ক কোন আইন জারি হয়নি, তবে গারো সম্পত্তি প্রথাকেই গারো সম্পত্তি আইন বলা হয়ে থাকে। ঐ সম্পত্তি প্রথাই রেভা: সি. বলডুইনের “গারো আইন” নামক পুস্তকে এইরূপ লেখা আছে। সাধারণ আইন, ধারা ১। “গারোদের মধ্যে প্রচলিত মাতৃতন্ত্র অনুযায়ী কোন পুরুষ কোন প্রকার সম্পত্তির অধিকারী হইতে পারে না। পুরুষ সন্তান বয়ঃপ্রাপ্ত হউক বা না হউক সে যাহা অর্জন করে বা অন্যের নিকট হইতে লাভ করবে, সমস্তই তাহার মাতার বা ভগ্নীদের সম্পত্তি হইবে। বিবাহিত পুরুষ যাহা কিছু অর্জন করে, সমস্তই তাহার পত্নীর সম্পত্তি হইবে, বা পত্নীবিয়োগ ঘটিয়া থাকিলে তাহার কন্যার সম্পত্তি হইবে। মাতা বা পত্নী বা কন্যা বা ভগ্নীদের মৃত্যু ঘটিয়া থাকিলে পুরুষের অর্জিত সম্পত্তি তাহার মাতৃগোত্রের নিকটতমা আত্মীয়ার হইবে।”

২. চরম “মাহারি” পন্থীরা গারো সম্পত্তি প্রথা যে ভাবে ব্যাখ্যা করে থাকে সেই ভাবেই তা লেখা হয়েছে। তদনুযায়ী পুরুষকে সম্পূর্ণরূপে সম্পত্তি স্বত্ব বঞ্চিত করা হয়েছে। এই রকম প্রথা যুক্তিযুক্ত কিনা, ন্যায়সংগত কিনা, তা আজ শিক্ষিত গারো সমাজের চিন্তা করে দেখার সময় উপস্থিত হয়েছে।

৩. উপরিউক্ত পুস্তকের সাধারণ আইন, ধারা ২ বলছে, “পুরুষ লোক তাহার নিজ বাড়িতে ও কোন সম্পত্তি বা দান বা অপসারণ করিতে পারে না। তাহা করিতে চাহিলে তাহাকে অবস্থা বিশেষে পত্নীর বা ভগ্নীদের অনুমতি লইতে হইবে। সে অনুমতি ছাড়া সম্পত্তি বিক্রয় বা দান বা অপসারণ করিলে গারো আইনে চুরি করা হয়।” চুরি করা মানে কি? চুরি করা মানে সম্পত্তির অধিকার লঙ্ঘন করা। বাড়ির সম্পত্তির অধিকারিণী হল স্ত্রী ও কন্যা, কাজেই ঐ সম্পত্তির কিছু বিক্রয় বা দান বা অপসারণ যদি পিতা ও স্বামী করে সে চুরি করে। পুরুষের পক্ষে এমন অমর্যাদাজনক ও লজ্জাজনক অবস্থা সভ্য জগতের আর কোন সমাজে আছে কি?

৪. আসুন আমরা দেখি পবিত্র বাইবেল কি বলে। পবিত্র বাইবেলে লেখা আছে, ঈশ্বরের বিধান আজ্ঞা ঈশ্বরের। আদি ৩:১৬। “পরে তিনি নারীকে কহিলেন, আমি তোমার গর্ভ বেদনা অতিশয় বৃদ্ধি করিব, তুমি বেদনাতে সন্তান প্রসব করিবে; এবং স্বামীর প্রতি তোমার বাসনা থাকিবে ও সে তোমার উপর কর্তৃত্ব করিবে।” আদি ২:১৫। “পরে সদাপ্রভু ঈশ্বর আদমকে লইয়া এদনস্থ উদ্যানের কৃষিকর্ম ও রক্ষার্থে তথায় রাখিলেন।” বাইবেলের এই কথাগুলিতে আমরা দেখি পুরুষই পরিবারের কর্তা ও পারিবারিক কাজ কর্মের কর্তা। কিন্তু গারো প্রথা এই ঐশ বিধানের বিপরীত ব্যবস্থা করেছে, স্ত্রীকে পরিবারের কর্ত্রী বানিয়েছে। এমন ব্যবস্থা যুক্তিযুক্ত নয়, সমাজের পক্ষে মঙ্গলজনক নয়। পরিবারের সম্পত্তি অর্জন, বৃদ্ধি ও রক্ষা করার ক্ষমতা পুরুষের যত আছে, স্ত্রী লোকের তত নেই। গারোদের ভূ-সম্পত্তি রক্ষা করতে পারছে না স্ত্রী লোকেরা তা তো আমরা চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি।

৫. আদি ১:২৮, ২৯ “ঈশ্বর কহিলেন, তোমরা প্রজাবন্ত ও বহুবংশ হও এবং পৃথিবী পরিপূর্ণ ও বশীভূত কর, আর সমুদ্রের মৎস্যগণের উপর, এবং ভূমিতে গমনশীল যাবতীয় জীবজন্তুর উপর কর্তৃত্ব কর। ঈশ্বর আরও কহিলেন, দেখ, আমি সমস্ত ভূতলে স্থিত যাবতীয় বীজোৎপাদক ওষধি ও যাবতীয় সবীজ ফলদায়ী বৃক্ষ তোমাদিগকে দিলাম তাহা তোমাদের খাদ্য হইবে।”

৬. এই ঐশ বিধানে মানুষকে তিনটি অধিকার দেয়া হয়েছে। প্রথম বিবাহ করার অধিকার, পরিবার গঠনের অধিকার “ তোমরা প্রজাবন্ত ও বহুবংশ হও।” এই অধিকার রক্ষা করার জন্য আজ্ঞা করেছেন (যাত্রা ২০:১৪) “ব্যভিচার করিও না।” দ্বিতীয়ত জীবন ধারণের অধিকার। এই অধিকার রক্ষার জন্য তিনি আজ্ঞা দিয়েছেন (যাত্রা ২০:১৩) “নরহত্যা করিও না।” তৃতীয়ত সম্পত্তি অর্জনের অধিকার। “কর্তৃত্ব কর,” “তোমার খাদ্য হইবে” -এই কথাগুলি বোঝায় মানুষ তার জীবন ধারণের প্রয়োজনে জীবজন্তুর উপর কর্তৃত্ব করবে ও ভূমি থেকে খাদ্য সংগ্রহ করবে । অর্থাৎ সে ভূমি নিজের করতে পারে, যা এইভাবে সে নিজের করে লয় তাই তার সম্পত্তি। তার সম্পত্তির অধিকার রক্ষার জন্য তিনি আজ্ঞা করেছেন: “চুরি করিও না”। ঈশ্বরের দেয়া এই অধিকারগলিকে মৌলিক অধিকার বলে। কারণ এই অধিকারগুলি কেউ কেড়ে নিতে পারে না। এই অধিকারগুলি রক্ষা করার জন্য ঈশ্বর আজ্ঞাগুলি দিয়েছেন। গারো প্রথা কিন্তু পুরুষকে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করবার চেষ্টা পায় তাই তা ঈশ্বরের আজ্ঞার বিরুদ্ধে, তা অন্যায়।

৭. অতি প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ এই বিশাল পৃথিবীর একখন্ড ভূমি পরিষ্কার করে আবাদযোগ্য করেছে, নিজের করেছে, এই ভূমি তার সম্পত্তি। এই ভূমির এক অংশের উপর সে ঘর বেধেঁছে। এই ঘর তার সম্পত্তি। সে লাঙ্গল বানিয়ে নিয়েছে, বন্য জন্তু পোষ মানিয়ে হাল চাষের যোগ্য করে নিয়েছে। এই লাঙ্গল ও বলদ জোড়া তার সম্পত্তি। ভূমি চাষ করেছে, খাদ্য উৎপন্ন করেছে। এই খাদ্য মজুত করেছে, ভবিষ্যতের জন্য এই খাদ্যের দ্বারা নিজের জীবন ধারণ করেছে, পরিবার পালন করেছে। এই খাদ্যও তার সম্পত্তি। এই সম্পত্তি অর্জনের অধিকার প্রত্যেক মানুষেরই আছে, গারো পুরুষেরও আছে, থাকতে হবে। ঈশ্বরের বিধানে পুরুষই পরিবারের কর্তা। অব্রাহাম, ইসয়হাক, যাকোব পরিবারের কর্তা ছিলেন। গারো পুরুষকেও পরিবারের কর্তা হবার যোগ্যতা ঈশ্বর দিয়েছেন। তাই পুরুষ না হলে গারো পরিবারও চলতে পারে না, গারো সম্পত্তি রক্ষা পায় না, বুদ্ধি পায় না, উন্নতি হয় না।

৮. প্রায় এক হাজার বৎসর পূর্বেই গারোদের বাংলার ভূমিতে দেখা গিয়েছিল। বিশেষত চারিশত বৎসর পূর্বে বহু গারো পাহাড় থেকে বাংলার সমভূমিতে আসতে লাগল। তখন গারো পুরুষেরা বহু জংগল পরিষ্কার করল, ভূমি তৈরি করে নিল, চাষ আরম্ভ করল, সম্পত্তি অর্জন করল। তাই এই জমিজামা সমস্তই পুরুষদের নামেই রেকর্ড করা হল। পুরুষদের অর্জিত সম্পত্তি স্ত্রীলোকের নামে রেকর্ড করা ঠিক হয়েছে? যুক্তির দিক দিয়ে ন্যায়ের দিক দিয়ে তা ঠিক হয়নি। এমন কি সমাজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলা যায়। এর দ্বারা সমাজের মঙ্গলও হয়নি।

৯. জাদি ও বউদি দুই বোন। তাদের জমিজামা তত্ত্বাবধান করা, খাজনা দেয়া ইত্যাদির ভার তারা রেখে দিয়েছিল তাদের মেসো ধকম মড়লের হাতে। এখন জরিপ চলছে, এটেস্টেশন চলছে। দেখা গেল জাদি ও বাউদির জমি সব ধমক মড়লের নামে রেকর্ড হয়ে রয়েছে। জাদি ও বাউদির মামাথাং গিসিক মোড়ল অনেক দৌড়াদৌড়ি ও খরচ করে ভাগিনীদের জমি তাদের জন্য উদ্বার করে দিয়েছে। সম্পত্তি রক্ষা ও দেখাশোনার শক্তি ও বৃদ্ধি স্ত্রীলোকদের কম। তাইতো গারো সম্পত্তি বৎসরের পর বৎসর চলে যাচ্ছে, ধ্বংস পাচ্ছে।

১০. সভ্য জাতিগণের মধ্যে পরিবারের কর্তা হয় পুরুষ। তাই তাদের উন্নতি হয়েছে আরও হচ্ছে। গারো সমাজে নারীরা পরিবারের কর্ত্রী, তাই তাদের সম্পত্তি ও সমাজ ধ্বংস পাচ্ছে। আমাদের বিবেক বুদ্ধিও তো বলে যে, নারী কর্ত্রী হবে এবং পুরুষ তার অধীনে থাকবে তা বেমানান, পুরুষের পক্ষে অমর্যাদাকর।

১১. পরিবার ও সমাজ বিষয়ে শ্রেষ্ঠ মনীষীদের উৎকৃষ্ট চিন্তা গবেষণা প্রকাশ পেয়েছে সমাজবিজ্ঞান, পৌরবিজ্ঞান, অর্থশাস্ত্র, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইত্যাদিতে। এই বিজ্ঞানগুলি আমাদের বলেছে যে, মানুষের কতকগুলি অধিকার আছে যেগুলিকে মৌলিক বলা হয়। কারণ এই অধিকারগুলি না থাকলে মানুষের পক্ষে মানুষের মতো জীবনধারণ করা অসম্ভব। মৌলিক অধিকারগুলির একটি হচ্ছে সম্পত্তির স্বত্বাধিকার, অপর একটি হচ্ছে বিবাহের অধিকার। এই অধিকারগুলি থেকে মানুষকে কেউ বঞ্চিত করতে পারে না, রাষ্ট্রও পারে না, কোন সমাজও পারে না। গারো প্রথা যাই বলুক না কেন, গারো পুরুষের সম্পত্তির অধিকার রয়ে গেছে, তা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। তবে তাকে তার এই অধিকার উদ্ধার করতে হবে স্ত্রীলোকের হাত থেকে ঠিক যেমন জাদি ও বাউদি তাদের উদ্ধার করে নিয়েছিল ধমক মোড়লের হাত থেকে। আন্তর্জাতিক আইন ও সভ্য সমাজের আইন তাকে সাহায্য করবে তার সম্পত্তির স্বত্ব ফিরে পেতে, যেমন গিসিক মোড়ল জাদি ও বাউদিকে সাহয্য করেছিল তাদের জমিস্বত্ব ফিরে পেতে।

১২. বলডুইনের পরিবার বিষয়ক আইন, ধারা ২০ বলেছে- “পুত্রগণ মাতার ভরণপোষণ করিয়া থাকিলে মাতা চ্রা ও নকচিকবর্গের সম্পত্তি লইয়া অধিক পক্ষে অর্ধেক সম্পত্তি পারিশ্রমিক হিসাবে পুত্রগণকে দিতে পারে। কিন্তু তাহারা এই সম্পত্তির স্বত্ব অর্জন করে না। বিবাহিত হইলে তাহারা ইহার ভোগাধিকার হারায়।” গারো সম্পত্তি প্রথা পুরুষের প্রতি আর একটি অন্যায় করেছে, তা হলো পুত্র সন্তানকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা।

১৩. জাকফা ও জাকমা স্বামী ও স্ত্রী। তাদের পুত্র সন্তানের নাম জাকগারা। জাকগারা নাম উপযুক্তই হয়েছে; কারণ ডান হাত যেমন সাহায্য করতে পারে; বাঁ- হাত তেমন সাহায্য করতে পারে না। জাকমার ভগ্নীর নাক জাকগাসি। জাকগাসির মেয়ের নাম হল জাকসি। বাঁ-হাতের অঙ্গুল যেমন দুর্বল তেমনি জাকগাসির মেয়ে জাকসি, জাকফা ও জাকমাকে বেশি সাহায্য করতে পারবে না যেমন পারবে জাকগারা। তবু জাকফা ও জাকমা তাদের দশ একর সম্পত্তি ও বাগান বাগিচা সমস্তই জাকসিকে দিল। জাকগারকে কিছুই দিল না। দ্বিতীয় বিবরণ ৫/১৬ “তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভুর আজ্ঞানুসারে তোমার পিতাকে ও তোমার মাতাকে সমাদর করিও; যেন তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমাকে যে দেশ দেন; সেই দেশে তোমার দীর্ঘ পরমায়ু হয় ও তুমি মঙ্গল প্রাপ্ত হও।” ঈশ্বর জাকগারাকে অধিকার ও দায়িত্ব দিচ্ছেন তার মাতা পিতাকে বৃদ্ধ বয়সে ভরণপোষণ করার জন্য। কিন্তু জাকসিকে এই অধিকার ও দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। কাজেই এই দায়িত্ব জাকগারা যত ভালমতো পালন করতে পারবে; জাকসি তত পারবে না। গারো প্রথা পুত্রের অধিকার ও দায়িত্ব অন্যের মেয়ে সন্তানের উপর চাপিয়ে দিয়ে মস্ত বড় ভুল করেছে।

১৪. মাতাপিতার প্রথম অধিকার ও দায়িত্ব হল আপন পুত্র কন্যার প্রতি, অন্যের পুত্র কন্যার প্রতি নহে। জাকপা ও জাকমার প্রথম অধিকার ও দায়িত্ব হল জাকগারার প্রতি, জাকসির প্রতি নহে। ঈশ্বরের আইনও প্রকৃতির আইনে জাকপা ও জাকমার সম্পত্তির উপর ও স্নেহ ভালবাসার উপর জাকগারার অধিকার আছে। কিন্তু জাকসির নেই। তবু গারো প্রথামতো জাকফা ও জাকমা নিজের পুত্রকে সম্পত্তি দিল না, নিজের পুত্রকে ভালবাসাল না। তারা অন্যের কন্যাকেই সম্পত্তি দিল, বেশি ভালবাসা দিল। ইহা অস্বাভাবিক। ইহা প্রকৃতির নিয়মের বিরদ্ধে। ইতর প্রাণীরাও প্রকৃতির নিয়ম পালন করতে জানে। গরু, কুকুর, বিড়াল নিজ নিজ সন্তানকেই পালন করে, আদর করে ভালবাসে। অন্যের সন্তানকে ভালবাসতে যায় না। বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হয়ে গারো মাতা পিতা এমন অস্বাভাবিক যে তারা নিজের ছেলেকে ভালবাসা সত্ত্বেও গারো আইনের জন্য তার সম্পত্তি অন্য মেয়েকে দিতে বাধ্য হয়।

১৫. গারো সম্পত্তি প্রথা নিয়ে আমরা যে আলোচনা করলাম তা থেকে বুঝছি তা পরিবর্তন করা আবশ্যক। কেন পরিবর্তন করা উচিত তার কারণগুলিও বিশদভাবে আলোচনা করেছি। কারণগুলি সংক্ষেপে এই:-

(১) প্রত্যেক মানুষকে ঈশ্বর কর্মশক্তি দিয়েছেন যেন জীবনধারণের উপযুক্ত সম্পত্তি অর্জন করতে পারে। নিজের কর্মশক্তি ও বুদ্ধি দ্বারা অর্জিত সম্পত্তির উপর তার অধিকার আছে।

(২) জীবন ধারণের জন্য সম্পত্তি আবশ্যক; তাই জীবন ধারণের অধিকার এসেছে। জীবনধারণের অধিকার যেমন মৌলিক; তেমনি সম্পত্তির অধিকারও মৌলিক; অর্থাৎ এ অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারে না।

(৩) আন্তর্জাতিক, আইন বলছে যে, সম্পত্তির অধিকার মানুষের একটা মৌলিক অধিকার।

(৪) সমাজতত্ত্ব, পৌরবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থবিজ্ঞান বলছে যে, সম্পত্তির অধিকার একটি মৌলিক অথিকার।

(৫) পৌরবিজ্ঞানবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানবিদ পন্ডিতগণ বলেছেন যে, দায়িত্ব ও অধিকার একটি অপরটি ছাড়া থাকতে পারে না। দায়িত্ব ছাড়া অধিকার নেই এবং অধিকার ছাড়া দায়িত্ব নেই। পুরুষকে যদি পরিবার পালনের দায়িত্ব দিতে চাও, সন্তান পালনের দায়িত্ব দিতে চাও, জমিজামা রক্ষা অর্জন ও বৃদ্ধি সাধনের দায়িত্ব দিতে চাও, তবে সন্তানের উপর অধিকারও তাকে দিতে হবে। অধিকার না দিয়ে শুধু দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া যায় না। কাজেই পুরুষেরা যদি সম্পত্তি ঠিকমতো রক্ষা না করে, তারা যদি সন্তান পালনে উদাসীন হয়, তজ্জন্য দায়ী গারো সম্পত্তি প্রথা।

(৬) ঈশ্বরের বিধান প্রকৃতির নিয়ম এই যে, মাতাপিতা আপন পুত্র কন্যাকে প্রথম ভালবাসবে। অতঃপর অন্যের পুত্র কন্যাকে ভালবাসতে পারে। গারো প্রথা এমন করে রেখেছে মনে হয় তারা তাদের পুত্র সন্তানকে ভালবাসে না। নিজ পুত্রকে সম্পত্তি না দিয়ে অন্যের মেয়েকে সম্পত্তি দেয়। এই আচরণ অস্বাভাবিক।

১৬. গারো সম্পত্তি প্রথা পরিবর্তন করার সপক্ষে যে যুক্তিগুলি উপরে দেওয়া গেল সেইগুলি সমস্ত ধর্ম, সমস্ত সভ্য জাতি ও মানুষকে বিবেক বুদ্ধি স্বীকার করে নিয়েছে, তাই ঐগুলি অখন্ডনীয়। আরও কতগুলি মানবিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে যার জন্য গারো সম্পত্তি প্রথা অবশ্য পরিবর্তনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৭.  তুমি একজন গারো মেয়ে। তোমার মাতার পাঁচ একর জমি ছিল। তোমার পিতা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে হাল চাষ করেছে। বুদ্ধি প্রয়োগ করে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে। তাই সে স্বচ্ছন্দে স্ত্রী পুত্র কন্যা পালন করেছে। শুধু তাই নয়, অনেক বৎসর হাড়ভাঙ্গা খাঁটুনি খেঁটে আরও পাঁচ একর জমি ক্রয় করতে পেরেছে। তোমার মাতার মৃত্যু হয়। এখন তুমি গারো প্রথা অনুযায়ী পরিবারের কর্ত্রী হয়েছ। তুমি বড় মেয়ে, তোমাকে তোমার পিতা ভাল জামাই এনে বিয়ে দিয়েছে। তোমার মাতার মৃত্যু হয়। এখন তুমি গারো প্রথা অনুযায়ী পরিবারের কর্ত্রী হয়েছ। তুমি তোমার বাবাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলে। গারো প্রথা তোমাকে এই ক্ষমতা দিয়েছে। তোমার বাবা অন্যের বাড়িতে গরু চরায়, এইভাবে জীবিকা অর্জন করছে। তুমি মেয়ে হয়ে তোমার বাবাকে অন্যের বাড়িতে গরু চরিয়ে খেতে দেখছ। এই গারো প্রথা অমানবিক, তোমার কাজও অন্যায়।

১৮. চিন্তা করে দেখ, একটা কুকুরী বাচ্চাগুলিকে দুধ দিয়ে পালন করল, নিজের প্রাণ বিপন্ন করে শৃগালের আক্রমণ থেকে রক্ষা করল। বাচ্চাগুলি বড় হল। কুকুরী এখন বুড়ী হয়েছে, একদিন সে ক্ষুধার্ত অবস্থায় এক টুকরা মাংস খেতে বসেছে, তখন তার বাচ্চা এসে ঐ মাংস খন্ড কেড়ে নিয়ে খেয়ে ফেলল। কুকুরের বুদ্ধি নেই, বিবেক নেই, সে পশু। তার আচরণ পশুর যোগ্যই হবে। পশুর যোগ্য আচরণকে পাশবিকতা বলে। তুমি কিন্তু মানুষ, তোমার আচরণ মানুষের যোগ্য হওয়া উচিত। মানুষের যোগ্য আচরণকে মানবতা বলে। কিন্তু তোমার আচরণে মানবতা নেই, আছে পাশবিকতা।

১৯. শোন ঈশ্বর কি বলেন। হিতো ২৮/২৪ “ যে পিতামাতার ধন কড়িয়া বলে, এত অধর্ম নয়; সে ব্যক্তি বিনাশকের সখা।” তোমার সম্বন্ধে ঈশ্বর বলবেন “তুমি বিনাশকের সখী”, কারণ তুমি পিতামাতাকে তাড়িয়ে দিয়েছ, কিন্তু তোমার সম্পত্তি তো তোমার নয়, তা হল তোমার পিতার । তোমার পিতা তা রক্ষা করেছে, তুমি রক্ষা করনি। তোমার পিতা নিজের কর্মশক্তির দ্বারা সম্পত্তি অর্জন করেছে, তুমি করনি। শোন, প্রভু যীশু কি বলেন। মথি ১৫/৩-৭ “ তোমার ও আপনাদের পরম্পরাগত বিধির জন্য ঈশ্বরের আজ্ঞা লঙ্ঘন কর কেন? কারণ ঈশ্বর বলিইয়াছেন- তুমি আপন পিতাকে ও আপন মাতাকে সমাদর করিও। আর যে কেহ পিতার কি মাতার নিন্দা করে, তাহার প্রাণদন্ড অবশ্য হইবে।” কিন্তু তোমার বলিয়া থাক, যে ব্যক্তি পিতাকে কি মাতাকে বলে, ‘আমা হইতে যাহা কিছু তোমার উপকার হইতে পারিত, তাহা ঈশ্বরকে দত্ত হইয়াছে, সে আপন পিতাকে বা আপন মাতাকে আর সমাদর করিবে না। এইরূপে তোমরা আপনাদের পরস্পরাগত বিধির জন্য ঈশ্বরের বাক্য নিষ্ফল করিয়াছ।’ আজ যদি যীশু গারো অঞ্চলে আসতেন, তিনি বলতেন, তোমরা তোমাদের মাতৃতান্ত্রিক প্রথার জন্য ঈশ্বরের বাক্য নিষ্ফল করেছ।

২০. দিবব্রেং ছিল একজন মেধাবী যুবক। সে ভালভাবে ম্যাট্রিক পাস করেছিল। অতঃপর গারো ব্যাপ্তিস্ট ইউনিয়নের ছাত্রবৃত্তি পেয়ে পিটিআই পাস করল প্রথম ডিভিশনে। সে পনের বৎসরব্যাপী স্কুল মাস্টারী করতে থাকল। সে ছিল মিতব্যয়ী ও সঞ্চয়ী। হিসাব পূর্বক টাকা সঞ্চয় করে নিয়ে পাঁচ একর জমি ক্রয় করল। যখন সে বিয়ে করতে যাবে তার মাতার ভগ্নীর মেয়ে দুইজন বঞ্চনা ও গজ্ঞনা বলল, মামা তুমি যে জমি কিনেছ তা তুমি নিয়ে যেতে পারবে না; ঐ জমি আমাদের হবে গারো প্রথা অনুযায়ী। বঞ্চনা ও গজ্ঞনার মামাথাং গংগিগিপা ছিল চতুর লোক; সে বলল, অবিবাহিত গারো পুরুষ যা কিছু সম্পত্তি অর্জন করে সমস্তই হবে তার মাথার বা ভগ্নীর, তা তার নিজের হতে পারে না। ওয়েলফেয়ার থানা পরিষদের মেম্বার বুদাপগিপা মারাক গংগিগিপার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কিনা, তাই সে বলল, গারো সমাজে পুরুষের নামে কোন সম্পত্তিই থাকতে পারে না। শেষ পর্যন্ত দিমব্রেং তার নিজের শ্রমার্জিত জমি থেকে বঞ্চিত হল। গ্রামের লোকেরা অবশ্য বলল, মাস্টারী করে যে টাক সঞ্চয় করেছিল দিমব্রেং তাই দিয়ে সে জমি কিনেছিল কিন্তু ভাগিনীরা ঐ জমি থেকে বেচারাকে বঞ্চিত করল। সে নিজের টাকা দিয়ে দুইটা গাইও কিনেছিল, ঐগুলিও তাকে দিল। দিমব্রেং সরলচিত্ত লোক। ঝগড়া না করে সে বিয়ে করল, রিক্ত হস্তে সে শ্বশুর বাড়ি গেল।

২১. শ্বশুর বাড়ির বেশ ভূসম্পত্তি ছিল। বারো একর জমি। দিমব্রেং সুপারি বাগান করল, আম বাগান করল। শ্বশুর মারা গেল; শাশুড়ি মারা গেল। কয় বৎসরের মধ্যেই ফল বাগানগুলি থেকে বেশ আয় হতে থাকল। বীজ নির্বাচন; সার প্রয়োগ ও ভলমতো আবাদ করার ফলে বেশ আয় হতে থাকল। সে যথেষ্ট টাকা সঞ্চয় করল; পাঁচ একর জমি ক্রয় করতে চাইল। কিন্তু তার স্ত্রী রংরেটমার ব্যবহার তাকে খুব ব্যথিত ও নিরুৎসাহিত করে দিল। রংরেটরা বলল, “জমি কিনলে আমার নামে রেজিস্টারি করতে হবে; তোমার নামে কোন জমি রেজিস্টার করতে পারবে না। দিমব্রেং আর জমিই কিনল না। সব টাকা মদ খেয়ে ফূর্তি করে উড়িয়ে দিল। সে জমিজামার তদারকি করা ছেড়ে দিল। সে বলল, “আমি রৌদ্রে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে রাতদিন গাধার খাঁটুনি খেঁটে যে সম্পত্তি অর্জন করব তা থেকে আমি বঞ্চিত হব যখন আমার রংরেটরা মারা যাবে; কারণ সে তা আমার ভবিষ্যতের কোন ব্যবস্থা করতে নারাজ। আমার ছেলে আছে দুইজন; এরা জামাই যাবে। এখনই আমার স্ত্রীর বোনেরা কবে এই সম্পত্তি দখল করে ভোগ করবে সেই অপেক্ষায় অস্থির হয়ে উঠেছে। জমি বিক্রি করতে শেষ করে দিল দিমব্রেং তারপর শুধু রইল ভিটা বাড়িটা; আর সুপারি বাগানটা। বন্যায়; তারপর অনাবৃষ্টিতে অভাব দেখা দিলে সুপারি বাগানটাও বিক্রি হয়ে গেল। এইভাবে উন্নতিগামী পরিশ্রমী গারো যুবককে নিরুৎসাহ নিরুদ্যম করে দিয়েছে গারো সমাজ ব্যবস্থা তা তো আজ চিন্তাশীল গারোমায়েরই উপলব্ধি করা উচিত।

২২. রংরেটমার মামা চাঞ্চিসগগা সাংমা কিন্তু বুদ্ধিমান লোক ছিল। সে দিমব্রেংকে বলল, তোমার যে পাঁচ একর জমি তোমার ভগিনীরা ভোগদখল করেছে, তার সাবকাওলা কাগজপত্র তো তোমার সঙ্গে আছে, ঐ কাগজ পত্র নিয়ে তুমি আমার সঙ্গে চল জরিপ অফিসারের কাছে। সে বলডুইনের সংকলিত গারো আইনের একটা কপি নিয়ে চলল। তারা ঐ পুস্তকের পরিশিষ্ট জরিপ অফিসারকে পড়তে দিল। অফিসার বুঝলেন, স্বোপার্জিত পাঁচ একর জমির উপর দিমব্রেং এর স্বত্বাধিকার আছে, তার কাগজপত্রও সব ঠিক আছে। দিমব্রেং নূতন উদ্যমে আবার সুপারি বাগান করছে, এখন সে মদ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে।

২৩. Major A. Playfair পূর্ববাংলা আসামের ডেপুটি কমিশনার The Garos নামক পুস্তক ১৯০৯ সনে লেখেন। ঐ পুস্তকের ৭১ পৃষ্টায় লেখা আছে যে, স্বোপার্জিত সম্পত্তির উপর গারো পুরুষের স্বত্বাধিকার আছে। ঐ পুস্তককে ভিত্তি করে আদালতের বিচারকগণ রায় দিয়েছিলেন যে আপন অর্জিত সম্পত্তির উপর গারো পুরুষের স্বত্বাধিকার আছে। তিনটি রায়ের মধ্যে একটি হাইকোর্টের এবং দুইটি ডিস্ট্রিক কোর্টের। ডিস্ট্রিক কোর্টের রায়গুলি ১৯৩৯ সনে এবং ১৯৬৩ সনে দেওয়া হয়েছিল। এই দুইটি রায়ের সংক্ষেপে উপর-উক্ত পরিশিষ্টের মধ্যে দেওয়া হয়েছে। উক্ত দুইটি রায় পরিষ্কারভাবেই বলেছে যে-

(১) আপন স্বোপার্জিত সম্পত্তির উপর গারো পুরুষের স্বত্বাধিকার আছে।

(২) উক্ত স্বত্ব তার জীবিতকালে তার মাতা বা ভগ্নী বা স্ত্রীর উপর বর্তায় না। অর্থাৎ ঐ সম্পত্তি তার জীবিতকালে তার মাতা বা ভগ্নী বা স্ত্রী কেড়ে নিতে পারে না।

(৩) স্বামীর অর্জিত সম্পত্তি তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীর স্বত্বাধিকারভুক্ত হয়।

(৪) উক্ত সম্পত্তি স্বামী ও স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাদের পুত্র-কন্যা পাবে। কন্যা না থাকলেও পুত্র পাবে, কিন্তু স্ত্রীর গর্ভজাত পুত্রকে বাদ দিয়ে তা স্ত্রীর ভগ্নী বা ভগ্নী কন্যার কাছে যাবে না।

২৪. এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধে আমার বক্তব্য ছিল যে গারো সম্পত্তি প্রথার পরিবর্তন করা আবশ্যক। আদালতের রায়গুলির দ্বারা পরিবর্তন আরম্ভ হয়েছে। চরমপন্থীরা বলল যে গারো পুরুষের সম্পত্তি অর্জন করার অধিকার পর্যন্ত নেই। আশা করি আমি উপযুক্ত যুক্তি দেখাতে পেরেছি যে মানুষের সম্পত্তির স্বত্ব হল একটা মৌলিক অধিকার, তা কোন সমাজ বা আইন বা রাষ্ট্র বাতিল করতে পারে না। কিন্তু গারো সম্পত্তি প্রথা আরও অধিক পরিবর্তনের অপেক্ষা রাখে, তা আমার আলোচনা থেকে পরিষ্কার হয়েছে বলে আশা রাখি। এই প্রবন্ধের আবেদন সুধীজনের ও চিন্তাশীল গারো ভাই-বোনদের বিবেক বুদ্ধি ও হৃদয় মনের প্রতিই রইল।

উৎসঃ জানিরা সংকলনঃ দ্বিতীয় খন্ড, জুন ২০১৫ খ্রিস্টাব্দ।

আরো পড়ুনঃ

COMMENTS

Wordpress (0)
Disqus (1 )
error: Content is Copywrite!