garo wangala dancegaro wangala danceWanna folk Dance

গারোদের ওয়ানগালার তাৎপর্য: শষ্য দেবতা মিসি সালজংকে ধন্যবাদ উৎসর্গ

গারোদের ওয়ানগালার তাৎপর্য: শষ্য দেবতা মিসি সালজংকে ধন্যবাদ উৎসর্গ

রুয়েল সি. সাংমা

প্রাচীন যুগে মানুষ জীবন ধারণের জন্য বন আলু, বন কচু ও বিভিন্ন ধরনের বন্য মূল সমূহকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতো। ধান, গম, ভূট্টা ও ভোজনযোগ্য অন্যান্য শস্য তখন মানুষের কাছে অজানা ছিলো। সেই যুগে পৃথিবীতে গিসিল বল গিত্তল রিকগে সামল জাফাং মনল (Gisil Bol Gitol Rikge Samol Japhang Monol) নামে এক অতিকায় বৃক্ষ ছিলো। সেই বৃক্ষের চব্বিশটি শাখা ছিল । বারোটি শাখা পূর্বদিকে এবং অন্য বারোটি শাখা পশ্চিমদিকে বিস্তৃত ছিলো। আর গাছের একেক শাখা একেক ধরনের ফলে পরিপূর্ণ ছিলো। এক শাখায় ছিলো সর্বপ্রকারের মূল্যবান খনিজ যেমন- হীরক, স্বর্ণ, রৌপ্য; অন্য আরেক শাখায় বিভিন্ন ধরনের শস্যাদি যেমন- ধান, তুলো, রেশমসহ আরও অনেক।

সেই বৃক্ষের এক শাখায় ছিল আশ্চর্য ধরনের বিভিন্ন প্রজাতি আর রঙের ধান- লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, বেগুনি, কমলা, সাদা। Silchi Ringreram, Gitol Tingtotram, Do.katchi Nangroram, Rikgitok Nangsatram, Matma Ongtururam, Kitma Balgitoraram, Mongma Dangtoram, Matchu Kinma Onram, Udare Jakbri Megongma Kolatchi নামক দেশের আ-জারেক চিজাপা নামক জায়গায় সেই ধান দিয়ে আবৃত Giting Dinge Rane Dingje নামক একটা বাগান ছিল।

আশ্বচর্যের বিষয় কেউ এই শাখা থেকে ধানের ফল পেড়ে নিতে সক্ষম ছিল না, এমনকি সালগ্রা আর সুসুমির মত দেবতারাও ছিলেন না। কেননা, যখন উপর থেকে দেখা হতো মনে হতো যেন নিচ থেকে ফল পাড়া সহজ হবে, আর যখন উপর থেকে দেখা হতো তখন মনে হতো যেন উপর থেকেই পাড়া সহজ হবে।

একদিন বাতাসের দেবতা জারু মে-আ জাবাল ফান্তে অক্ষুয়াংসি জাফাত চংসি (Jaru Me.a Jabal Pante Okkhuangsi Japat-Chongsi) এবং শিলা আর ঝড়ের দেবতা মিখখা থেম্মা স্থিল রংমা’র (Mikka Temma Stil Rongma) একসাথে শক্তিশালী পায়ের ঝাঁকিতে সেই আশ্চর্য ধানের কিছু বীজ মাটিতে পড়লো কিন্তু বাতাসের দেবতা তা খেয়াল করলেন না। তিনি দলওয়াক দওদিকখি (Dolwak Do-dikki) তে বসে আপনমনে বাঁশি বাজাতে লাগলেন। এদিকে দেবী আ-নিং নকসিক চিনিং নমিন্দিল আ-নিং ডিপারি চিনিং ডিপারা (Ah-ning Noksik Chining Nomindil Ah-ning Diperi Chining Dipera) মাটি থেকে ধানের বীজগুলো তুলে এনে তার নিজের বাগানে বপন করলেন। পরবর্তীতে দেবতা মিসি আপিলফা সালজং দেবী আ-নিং নকসিকের কাছ থেকে কিছু ধান নিয়ে নিজের জমিতে বপন করলেন। সেই সময়ে দেবতা মিসি আপিলফার খাদ্য গ্রহণের জন্য উপযুক্ত এমন সকল ধরনের শস্যের উপর একচেটিয়া অধিকার ছিলো।

একদিন মিসি আপিলফা সালজং যখন আন-থি রাচা আখাং গিত্তেল হাটে যাচ্ছিলেন, পথে আ-নি আপিলফা চিনি গালাফার সাথে তাঁর দেখা হলো যার অন্য নাম ছিল রাসং। সেই লোকের হাতে ছিলো একটি নিড়ানি যার দ্বারা সে মাটি খুঁড়ে খাবারের জন্য বিভিন্ন ধরনের আলু ও বন্যমূল সংগ্রহ করতো। সে বেঁচে থাকার জন্য নিত্য পরিশ্রম করার কারণে তার পরনে গাছের বাকলের তৈরী পোষাক ছিল যা খুবই জীর্ণ। তাঁর মাথা থেকে পা পর্যন্ত সারা শরীর ধুলোমাটি দিয়ে ঢাকা ছিল। সেই লোক যখন মিসি আপিলফা সালজংকে দেখতে পেলো তখন নিজের জীর্ণতায় লজ্জা পেয়ে নিজেকে একটা বড় পাথরের আড়ালে লুকালো। কিন্তু মিসি সালজং তাকে দেখতে পেয়ে বেরিয়ে আসতে বললেন। এবং তার কাছে নাম জানতে চাইলেন। লোকটি ভয়ার্ত মনে উত্তর দিয়ে বলল আমার নাম নি আপিলফা চিনি গালাফা তারপর মিসি সালজং সেই লোকের সাথে বন্ধুত্ব সম্পর্ক করলেন । আর তার সাথে গিয়ে “দংক্রেং” নামক গাছের নিচে একটা বড় পাথরের উপর দুপুরের খাবার খেতে বসলেন।

মিসি সালজং খাদ্য হিসেবে সাদা ভাত এবং মাছ খেতেন। কিন্তু আ-নি আপিলফা এই ধরনের খাদ্য সম্পর্কে জানত না, এ কারণে শুধু বন্য আলু ও মূলই তার খাদ্য ছিল। তার এই অসমৃদ্ধ খাবার লক্ষ্য করে মিসি সালজং তার কাছে জানতে চাইলেন, তুমি কি কখনও বন পরিস্কার করে জুম চাষ কর না? তুমি কি কখনও ধান বীজ বপন কর নি? আ-নি আপিলফা জানাল যে, সে বন পরিস্কার করে জুম চাষ করেছে কিন্তু ধান সম্পর্কে সে জানেনা। এতে মিসি সালজং ক্ষুদার্থ হয়ে নিজের খাবারের ভাত তার সাথে সহভাগিতা করলেন । এবং তাকে বললেন যে,আমি হাট শেষ করে বাড়ি ফিরে তোমার জন্য কিছু ধানের বীজ পাঠিয়ে দেবো। যখন তুমি ফসল পাবে, আমাকে স্মরণ কর আর সেই আশির্বাদিত প্রথম ফসলের কিছু অংশ ভোগ করবার পূর্বে আমার নামে উৎসর্গ করবে; এমনটা করবে প্রতিবছর”।

মিসি সালজং বাড়ি ফিরে তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নকখল জসিকসক ভৃত্যের মাধ্যমে কিছু ধান আ-নি আপিলফাকে পাঠালেন। কিন্তু সেই ভৃত্য ঈর্ষান্বিত হয়ে আধা শুকনো ধানের বীজ আ-নি আপিলফাকে এনে দিল। আ-নি আপিলফা অত্যন্ত উৎসাহ ও যত্নের সাথে বীজ রোপন করে দেখাশোনা করলেও সেই ধানের বীজ অঙ্কুরিত হলো না। এতে রেগে গিয়ে আ-নি আপিলফা মিসি সালজং এর স্বর্গীয় বার্তাবাহী দূত দিমরে, চুন, বাংশে ও বাংদিংকে নিজের কাছে বন্দি করে শিকলে বেঁধে রাখলেন। তখন মিসি সালজং পৃথিবীতে নেমে এসে তাকে অনুরোধ করলেন,আমার দূতদের আর্তনাদ আমার কানে গিয়ে পৌছেছে; তাদের আর্তচিৎকারের কারণে আমি এমনকি খাওয়াদাওয়াও করতে পারছিনা আমার দাস নকখল জসিকসক দোষী, তুমি এদেরকে ছেড়ে দাও আমি তোমার জন্য আবারও উত্তম বীজ পাঠাবো

তাতে সদয় হয়ে আ-নি আপিলফা মিসি সালজং এর দূতদের ছেড়ে দিলেন, আর নতুন উৎসাহ উদ্যমের সাথে আবার চাষ শুরু করলেন। যখন দক্ষিনা বাতাসের সাথে সাথে প্রথম বৃষ্টি এলো, তখন বীজ থেকে চারা গজিয়ে উঠল । এভাবে সময়ের সাথে ধান গাছগুলো পরিপুষ্ট হয়ে বড় হয়ে উঠল। যখন ধান কাটার সময় হয়ে এলো তখন Mattengke Mesewal এর এক ভৃত্য Krurangru Grikmesal আ-নি আপিলফার অজান্তে কিছু ধান জমি থেকে চুরি করল । এই সুযোগে সুগ্রা মান্থিজা দেবতা মিসি আপিলফা সালজং-এর কাছে গিয়ে আ-নি আপিলফার বিরুদ্ধে এই বলে মিথ্যা অভিযোগ করল যে, আ-নি আপিলফা তার প্রথম ফসল দেবতার জন্য আলাদা করে তো রাখেনি বরং সেই ফসল লুকিয়ে তোলা শুরু করেছে। এ সংবাদে ক্রুদ্ধ হয়ে মিসি সালজং আ-নি আপিলফার পুত্রদের এবং তাঁর বার্তাবাহক আ-নি আপিল, চিনি গালা, আ-নি দিমরে, চিনি বাংশে, আ-নি চুন, চিনি বাংদিংদের বন্দি করলেন।

তখন আ-নি আপিলফা মিসি সালজং এর কাছে গিয়ে অনুনয় করে বললেন,আমি এখনও ফসল তুলিনি, আমি আর আমার পরিবার যাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি তাকে কখনও ঠকাইনি Mattengke Mesewal এবং তাঁর ভৃত্য Krurangru Grikmesal মিলে ফসল চুরি করে আমাকে আপনার কাছে মিথ্যা বলে অপরাধী করেছে; অনুনয় করি আমার পুত্র বার্তাবাহকদের মুক্ত করে দিন তাতে মিসি সালজং বন্দিদের ছেড়ে দিলেন আর আ-নি আপিলফার সাথে নতুন করে সম্পর্ক করলেন।

যখন ফসল ঘরে তোলার জন্য পরিপক্ক হয়ে এলো, তখন আ-নি আপিলফা তার চাষের প্রথম ফসলের কিছু অংশ ধূপ আর মদ সহকারে নৈর্বেদ্য মিসি আপিলপা সালজং এর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করল।হে মিসি সালজং, বন্ধু আমার, তোমার কাছে এই প্রথম ফসল উৎসর্গ করলাম আমার প্রতি আর বিরাগ থেকোনা, আমার এই উপহার দেখে কি তোমার চোখে জল আসেনা? হে স্বর্গ নিবাসি, তোমার জন্য আমার ভালবাসা আর কৃতজ্ঞতা গভীর অনির্বচনীয়, অপরিসীম আমার ভক্তি, বর্ণনাতীত আমার শ্রদ্ধা আমার আশার অধিক দয়া তুমি আমাকে করেছো তুমি দুর্বল চারাগাছের যত্ন নিয়েছো, তাদের শক্তিশালী করেছো, তুমি তাদের ফলবান করেছো আমি আর আমার পরিবার ফসল ভোগ করবার আগে তুমি এসকল গ্রহণ কর

এভাবেই আ-নি আপিলপফা তার আচিক আহ্সংয়ের ভূমিতে জন্মানো ফসল মিসি সালজং এর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করলো। তাতে সন্তুষ্ট হয়ে মিসি সালজং তাকে এই বলে আশীর্বাদ করলেনএই লোক এবং তাঁর বংশধরদের ভূমিতে বেড়ে উঠুক এই শস্য; তার বংশ যেন চির আশীর্বাদিত থাকে প্রতিবছর পৃথিবীতে আমার আগমনের সময় সম্পন্ন হোক নৈবেদ্য উৎসর্গ

সেই থেকে আ-নি আপিলফা এবং তার সন্তানেরা প্রতি বছর জুম চাষ করতে থাকে এবং বিশ্বস্থার সাথে চাষের প্রত্যেক ফসলের জন্য দেবতা মিসি আপিলফা সালজং-এর উদ্দেশ্যে ধন্যবাদ উৎসর্গ প্রতিপাদন করতো, এভাবেই তারা ধান ও অন্যান্য ফসলের বীজ সংরক্ষণ করতো । আ-নি আপিলফা তার পুত্র-কন্যাদের সতর্ক করল যেন তারা উর্বরতার দেবতা মিসি আপিলপফা সালজং-এর সন্তুষ্টিতে কখনও অবহেলা না করে।

সেই থেকেই আ-নি আপিলফার উত্তরসূরি আচিকরা তাদের বছরের জুম চাষের প্রথম ফসল ধূপ জ্বেলে, মদ দিয়ে নৈর্বেদ্য উৎসর্গ করে মিসি আপিলফা সালজং এর উদ্দেশ্যে। সেই থেকে আমরা শস্য দেবতা মিসি সালজং কে স্মরণ করে চাষের প্রথম ফসল মুখে দেবার আগে তাঁকে উৎসর্গ করে কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন আচার-কৃত্যানুষ্ঠান চু-রুগালা, চা-চাত স’য়া এবং ওয়ানগালা পালন করে থাকি।

Reference

১. আখ্যায়নে- খিমচাং সাংমা আগিদক, সরাগিরি, গারো হিলস।

১. Origin of the Rice tale from Folktales of the Garo By Dewansingh Rongmutu.

Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
Disqus (0 )
error: Content is Copywrite!