Wanna folk Dancegaro wangala dancegaro wangala dance

গারোদের উৎসের অনুসন্ধান

গারোদের উৎসের অনুসন্ধান

Pronab Nokrek

ইতিহাস সবসময় সত্য কথা বলেনা। কথাটা বোধ করি সকলে নাও মানতে পারেন। আবার মানতেও পারেন। তবে আমার কথা হচ্ছে সে ইতিহাস কি অনুমান নির্ভর নাকি উৎস নির্ভর এখানে সেটাই মূখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ইতিহাস সবসময় উৎসের ওপর নির্ভরশীল। এজন্যই বলা হয়ে থাকে “History is based on sources “। তবে অনেক সময় অনুমান নির্ভর গৎবাঁধা ইতিহাসও রচিত হয়। কোন জাতি বা গোষ্ঠীর পরিচয় জানার জন্য আমাদের জানতে হয় সে জাতি বা গোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক পরিচয়। জানতে হয় তার ইতিহাস। আর সে ইতিহাস অবশ্যই উৎসনির্ভর হতে হবে। এক্ষেত্রে লিখিত বিভিন্ন গ্রন্থ, প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন, দলিল দস্তাবেজ গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করে ।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন ” বাঙ্গালার ইতিহাস চাই। নহিলে বাঙ্গালি কখনও মানুষ হইবে না। ” বাংলার তথা বাঙালির ইতিহাস অনুসন্ধানের কাজ বর্তমানে অনেক এগিয়ে গেছে। কারণ অনেক প্রাচীন নিদর্শন এরই মধ্যে আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে বাঙালি মানুষ হয়েছে কিনা এ প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। তবে বঙ্কিমের সুরে সুর মিলিয়ে বলতে চাই -গারোদের ইতিহাস চাই। আর সে ইতিহাস সবাইকে (গারো) জানতে ও চর্চা করতে হবে। তা না হলে গারো জাতি পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে না ।

অনেক গবেষক (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে) গারোদের বিষয়ে বর্তমান সময়ে অনেক কিছুই লেখার চেষ্টা করেছেন এবং করছেন। এক্ষেত্রে অনেকটা এগিয়েও গেছে গারোদের ইতিহাস অনুসন্ধানের কাজ। যা আমাদের জন্য অনেকটা প্রখর রোদে তৃষ্ণা মেটানো ঠান্ডা জলের মতো। কিছুটা হলেও আমরা নিজেদের সম্পর্কে জানার ক্ষুধা নিবারণ করতে পারছি। তবে কিছু বিষয় আমার এ ক্ষুধার উদ্রেক বাড়িয়ে দিয়েছে আরও বহুগুণে। তাই আমার এই বিষয়ে কিছু লেখার প্রয়াস। কোন একটি জাতির উৎস অনুসন্ধানে নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও সামাজিক বিবর্তনের ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে একটি জাতির উৎস অনুসন্ধানে। তাই গারোদের ইতিহাস অনুসন্ধানে এসব বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে ।

গারোরা মূলত মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত ৷ গারোদের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে এটা অনেক নৃ-বিজ্ঞানী স্বীকার করেছেন। অনেকের মতে গারোদের আগমন ঘটেছে তিব্বত হতে । তবে আবার অনেকে মনে করেন গারো চীনের ইয়াংসিকিয়াং ও হোয়াং প্রদেশ হতে এ অঞ্চলে এসেছে। কিন্তু কখন থেকে এসব অঞ্চলে গারোদের বাস তা এখনও জানার অতীত হয়ে আছে। আর তা সঠিকভাবে বলাও দুঃসাধ্য। কারণ গারোদের ঐরকম কোন লিখিত উৎস নেই। তবে দুঃসাধ্য হলেও চেষ্টা করতে তো আর মানা নেই। এখন মূল কথায় আসা যাক। কিন্তু মূল কথায় যাওয়ার প্রারম্ভে কিছু বিষয় সম্পর্কে পূর্বেই জেনে রাখা ভাল।

১.গারো জাতি যে মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত এটা প্রায় স্বীকৃত। 
২. বাঙালিরা রক্ত সংকর জাতি এটাও প্রায় স্বীকৃত। তবে বিভিন্ন গোত্রের রক্তের আনুপাতিক হার নিয়ে মতভেদ রয়েছে। 
৩. গারোদের নিজস্ব কোন শিলালিপি, তাম্রলিপি তথা লিখিত কোন উৎস নেই। 
৪. বাংলা ভাষায় অনার্য ভাষার প্রভাব রয়েছে।
৫. মঙ্গোলীয়রা আর্যদের পূর্বে ভারতবর্ষে আগমন করে।

গারোরা যে মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত এটা অনেক নৃ-বিজ্ঞানী তাদের গবেষণায় বলেছেন। নৃ-তত্ত্ববিদ ড. জে এইচ হাটন গারোদের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠী বলে অভিহিত করছেন। আর ক্রমে বহু পূর্বে চীন হতে স্থানান্তরিত হয়ে বর্তমানে এসব অঞ্চলে (আসাম ও গারো পাহাড়ের পাদদেশে এবং বাংলার প্রান্তে পার্বত্য এলাকায়) বাস করছে। তবে স্যার হার্বাট রিজলীর মতে গারো জাতি আসামের আদিবাসী। প্রখ্যাত নৃ- তত্ত্ববিদ ডেল্টনের মতে আর্যদের আগমনের পূর্বেই কোচবিহার ও আসামে গারো ও খাসিদের বাস ছিল। জাতিতত্ত্ববিদ ও গারোহিল জেলার প্রশাসক মেজর এ প্লেফেয়ার্স বলেছেন – কোন সুদূর প্রাগৈতিহাসিক যুগে গারোরা উত্তর পশ্চিম চীন দেশের ইয়াংসিকিয়াং হোয়াং প্রদেশে বাস করতো, সেখান থেকে তারা তিব্বতে এসেছিল এবং ক্রমে প্রায় ত্রয়োদশ খ্রিস্টাব্দে আসাম কোচবিহারে বসবাস করতে লাগলো। ” এক্ষেত্রে কোন নৃ-তত্ত্ববিদের কথা গ্রহণযোগ্য তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে রিজলীর বক্তব্য কিছুটা হলেও প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। কেননা গারোরা যদি মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত হয় তাহলে অবশ্যই তাদের আদিনিবাস আসাম হতে পারেনা। কারণ মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠী প্রায় বার থেকে দশ হাজার বছর পূর্বে মঙ্গোলিয়া হতে চীনে প্রবেশ করে। আর প্রায় তিন থেকে পাঁচ হাজার বছর পূর্বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে ভারতবর্ষে আগমন করে। তবে মঙ্গোলীয় জাতিসত্ত্বাকে যে দশটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে গারোরা কোন ভাগের অন্তর্ভূক্ত তা নিয়ে অস্পষ্টতা থাকতে পারে। তাই রিজলীর বক্তব্য প্রশ্নবোধক হলেও ড. জে এইচ হাটন ও মেজর এ প্লেফেয়ার্স এর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কারণ মঙ্গোলীয়দের ইতিহাস তাদের বক্তব্যকে সমর্থন করে।

স্যার হার্বাট রিজলীর মতে, বাঙালিরা প্রধানত মঙ্গোলীয় ও দ্রাবিড় নরগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত। অধ্যাপক ড. আহমদ শরীফ তাঁর ” বাঙালির মনন – বৈশিষ্ট্য ” প্রবন্ধে বলেন – “… বাঙালিরা রক্ত সঙ্কর জাতি। বিভিন্ন গোত্রীয় রক্তের আনুপাতিক হার অবশ্য আজও অনির্ণীত। তবু প্রমাণে – অনুমানে বলা চলে শতকরা সত্তর ভাগ অস্ট্রিক, বিশ ভাগ ভোট – চীনা, পাঁচ ভাগ নিগ্রো এবং বাকি পাঁচ ভাগ অন্যান্য রক্ত রয়েছে। ” এছাড়াও তিনি তাঁর “বাংলাদেশের শতবর্ষের ইতিবৃত্তান্ত ” প্রবন্ধে বলছেন – “… আমরা বর্ণ ও রক্ত সঙ্কর মানুষ।… আর অন্যদিকে মঙ্গোল গৌত্রিক কিরাত, রাজবংশী, কিন্নর, গর্ন্ধব, নাগা, গারো, কোচ, মেচ, মিজো, কুকি, ত্রিপুরা, চাকমা, মারমা, আরাকানী বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে ও হিমালয়ের তিব্বত ও লুসাই পর্বতলগ্ন অঞ্চলে আমাদের রক্তসাঙ্কর্য এড়ানো সম্ভব হয়নি। হয়তো বলতে পারেন গারোদের উৎস অনুসন্ধানের কথা বলে কেন বাঙালি জাতির ইতিহাসের কথা বলছি। তবে বাঙালির ইতিহাসের সূত্র ধরেই গারোদের উৎসের কিছুটা অনুসন্ধান পেতে পারি। কারণ বাঙালির রক্তে মঙ্গোলীয়দের রক্তের প্রভাব রয়েছে। আর গারোরা এই মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত। তবে রিজলীর বাঙালী সম্পর্কে যে মত সেটা তাঁর মূল তত্ত্বের সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ তাঁর মূল তত্ত্বই হচ্ছে “ভারতীয় সমাজ, জাতিভেদ প্রথা কৌম সংগঠন আর্ন্তমিলনের পথে বড় বাধা বা প্রায় অনতিক্রম। “ তবে এটাও বলা যায় যে সেটা হয়তো শুধু বর্ণহিন্দু, সমাজের উচ্চ তথা ব্রাহ্মণ্য শ্রেণীর ক্ষেত্রে প্রযোয্য ছিল। সমাজের অন্যান্য নিচু শ্রেণীর ক্ষেত্রে সেটা হয়তো এতটা প্রবলভাবে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়নি। তানাহলে হয়ত চর্যাপদের কবি শবরপা বলতেন না –

উঞ্চা উঞ্চা পাবত তহি বসই সবরী বালী। 
মোরাঙ্গ পীচ্ছ পরিহাণ সবরী গীবত গুঞ্জরী মালী।। “

এখানে স্পষ্টত কবি শবরী বালিকার সৌন্দর্যে মুগ্ধ। তবে ড. নীহাররঞ্জন রায়ও বাঙালির রক্তপ্রবাহে মোঙ্গলীয়দের চিহ্ন পাওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু তিনি নিজেই আবার বলছেন – ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা হইতে একাধিক মোঙ্গোলীয় জন যে প্রাচীনকালে বাঙালীর জনপ্রবাহে রক্তধারা মিশাইয়াছে, কথা আগেই উল্লেখ করিয়াছি। বস্তুত বাঙলা আসামের প্রাচীন ইতিহাসে অঞ্চল হইতে একাধিক সমরাভিযান ব্রহ্মপুত্র –করতোয়া অতিক্রম করিয়া বাঙলাদেশে বিস্তৃত হইয়াছিল, তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়। কামরূপরাজ ভাস্কর বর্মার স্বল্পকাল স্থায়ী উত্তরবঙ্গ কর্ণসুবর্ণধিকার তাহার একটিমাত্র দৃষ্টান্ত। “

ড. আহমদ শরীফ তাঁর ” বাঙালিসত্তার স্বরূপ সন্ধানে ” প্রবন্ধে বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয় সম্পর্কে যা বলেছেন তা সংক্ষেপে এরূপ- আদি অস্ট্রিকরাই (আদি অস্ট্রাল) দেশের প্রাচীনতম বাসিন্দা। এরপরে আসে দ্রাবিড় ( ভড্ডিড ) জনগোষ্ঠী। এবং কালে এদের মধ্যে রক্তমিশ্রণ ঘটে। তারপর আসে হ্রস্বশির আলপাইনীর আর্যভাষী জনগোষ্ঠী। আর এই আর্যদের সমসময়ে বা আরো আগে হিমালয় ও লুসাই পর্বতের মালভূমি অধিত্যকা অঞ্চলে নেমে আসে বিভিন্ন গোত্রের মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠী। অস্ট্রিক – দ্রাবিড় – আলপীয় নরগোষ্ঠীর রক্তের সঙ্গে মিশ্রিত হয় এসব মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর রক্ত। এছাড়াও বিভিন্ন বিজেতা বা ব্যবসায়ী এবং নিগ্রোরক্তের মিশ্রণে ক্রমে আসামি বাঙালি উড়িয়ার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে।

 এখানে তিনি বলছেন যে হ্রস্বশির আলপাইনীর আর্যভাষী জনগোষ্ঠী যে সময়ে প্রাচ্য ভারতে প্রবেশ করে ঠিক সেসময়ে বা তারও পূর্বে বিভিন্ন মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠী হিমালয় ও লুসাই পর্বতের অধিত্যকা অঞ্চলে নেমে আসে। অর্থাৎ এসব মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠী প্রায় খ্রিস্ট পূর্ব ২০০০ অব্দে বা তারও পূর্বে এসব অঞ্চলে নেমে আসে। কেননা ঋগ্বেদ রচিত হয়েছিল খ্রিস্ট পূর্ব ২০০০ থেকে ৫০০ অব্দের মধ্য। আর এ ঋগ্বেদ আর্যভাষী জনগোষ্ঠীরাই রচনা করেছিল। এক্ষেত্রে মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠী প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে বা তারও আগে উত্তর ভারতের এসব অঞ্চলে প্রবেশ করে। আর এসব মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত গারোরাও ঠিক অনুরূপ সময়ে এসব অঞ্চলে আগমন করে এটা অনুমান করা যায়। তবে ড. নীহার রঞ্জন রায় বলছেন – আর্যদের ভারতাগমনের পূর্বে আর্যভাষা বিস্তৃতিলাভের আগে, বাঙলা, উড়িষ্যা, ছোটনাগপুর পর্যন্ত মোঙ্গোলীয় গোষ্ঠীর লোকেরা বিস্তৃতি লাভ করিয়াছিল, ইতিহাসে এমন কোনও প্রমাণ খুঁজিয়া পাওয়া যায় না।” কিন্তু আর্যদের ভারতাগমনের পূর্বে বাঙলা, উড়িষ্যা, ছোটনাগপুর এসব অঞ্চলে মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠী বিস্তৃতি লাভ না করলেও হিমালয় ও লুসাই পর্বতের অধিত্যকা অঞ্চলে নেমে আসে বলা যায়। আর ড. আহমদ শরীফ এসব পার্বত্য অঞ্চলের কথাই বলেছেন। পরবর্তীতে ক্রমে হয়তো ঐসব অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করে। কারণ অনেক পরিব্রাজকের ভ্রমণ-বৃত্তান্তে আমরা বিভিন্ন পথের বিবরণ পেয়ে থাকি। যেমন য়ুয়ান – চোয়াঙ এর বর্ণনায় ‘উত্তর-পূর্বমুখী’ পথ এবং চাঙ-কিয়েন ( খ্রি.পূ.- ১২৬ ) নামে চৈনিক রাজদূতের ভ্রমণ-বৃত্তান্তে ‘উত্তর ব্রহ্ম-মণিপুর-কামরূপ-আফগানিস্তান’ পথের বিবরণ পেয়ে থাকি।

আর এসব পথের মাধ্যমে বাংলার সাথে চীনের যোগাযোগ ঘটত। য়ুনান-চোয়াঙ বর্ণিত পথ সম্পর্কে ড. নীহাররঞ্জন রায় বলছেন – ” বাঙলার পূর্বদিকে কামরূপ রাজ্য, উত্তরে চীন ও তিব্বত। উত্তরবঙ্গ ও কামরূপের ভিতর দিয়া বাঙলাদেশ এই উত্তরশায়ী দেশদুটির সঙ্গে বানিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ রক্ষা করিত। ” এছাড়া চাঙ-কিয়েনের বর্ণনাতেও দেখি যে ব্যাকট্রিয়ার বাজারে দক্ষিণ-চীনের য়ুন্নান ও সজেচোয়ান প্রদেশজাত রেশমী বস্ত্র এবং সূক্ষ্ম বাঁশ দেখতে পেয়েছেন আর খোঁজ নিয়ে দেখেছেন এসব দ্রব্য চীন হতে আসত উত্তর ভারতবর্ষ জুড়ে লম্বমান সুদীর্ঘ পথ হয়ে আফগানিস্থান পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে। আর এসব দ্রব্য আসত সার্থকবাহ দলের পশু ও শকট বাহিনী ভর্তি হয়ে। অর্থাৎ চীনের সাথে ভারতবর্ষের বানিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ প্রাচীনকাল থেকেই ছিল। তাহলে ভারতবর্ষে মঙ্গোলীয়দের বিচরণ বা প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। আর এভাবেই ভারতবর্ষে মঙ্গোলীয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে। তবে এটাও ঠিক গারোরা হয়তো বানিজ্যিক প্রয়োজনে ভারতবর্ষে আসেনি। কারণ তাঁদের সামাজিক বিবর্তন এটা সমর্থন করেনা। বরঞ্চ তারা জুম চাষ তথা জীবিকার তাগিদেই হয়তো ধীরে ধীরে স্থানান্তরিত হয়ে এসব অঞ্চলে পারি জমিয়েছে।

 তবে এটা ঠিক যে মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীরা ভারতবর্ষে বহু পূর্ব হতেই আগমন করেছে। যার প্রমাণ আমরা অনেক চৈনিক পরিব্রাজকের বর্ণনায় পেয়েছি৷ এছাড়া ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর ” বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত” গ্রন্থেও বলেছেন আর্যদের আগমনের পূর্বে বঙ্গদেশে অনার্যরা বাস করত। এই অনার্যদের জাতি কি ছিল তিনি তা ভাষাতাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলছেন – ” এই সমস্ত অনার্য জাতিদিগের মধ্যে কাহারা প্রধানতঃ বঙ্গদেশের আদিম অধিবাসী ছিল, নৃতত্ত্বের দিক হইতে উহার উত্তর না পাইলেও ভাষাতত্ত্বের দিক হইতে ইহার কিছু মীমাংসা হইতে পারে।” ভাষাতাত্ত্বিক দিক হতে তিনি বাংলা ভাষায় মুণ্ডা বা কোল ভাষার প্রভাব দেখিয়েছেন। কারণ ধ্বনিতাত্ত্বিক, রূপতাত্ত্বিক, পদক্রম ও শব্দকোষের দিক থেকে বাংলা ভাষায় মুণ্ডা ভাষার প্রভাব রয়েছে। যেমন –

বাংলা                             মুণ্ডা

বড়শী                           বাড়শি
কালা (বধির)                 কালা
নেঙ্গা                            লেঙ্গা
আখড়া                        আখড়া
চাউল                          চাউলি

এমনি আরও অনেক শব্দ রয়েছে। তিনি বলতে চেয়েছেন বাংলা ভাষায় মুণ্ডা ভাষা ব্যতীত অন্যান্য অনার্য ভাষার প্রভাব নাই বললেই চলে। কিন্তু অন্যান্য অনার্য ভাষার প্রভাব কম থাকারও অনেক কারণ আছে। ঐসব অনার্য জনগোষ্ঠীরা বাংলার উত্তরে পার্বত্য অঞ্চলে বাস করত। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নিজেও বলেছেন ” সমস্ত বঙ্গদেশে কোলদিগের সমজাতীয় অনার্য জাতি বাস করিত বলিয়া অনুমান করিবার যথেষ্ট কারণ আছে। আর্য সংস্রবে তাহারা আর্য ভাষা ও আর্য সংস্কৃতি গ্রহণ করে ; কিন্তু তাহাদের কতক অংশ বাঙ্গালার পশ্চিমের ও পূর্বের পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় লইয়া বর্তমান কোল ও খাসিয়া জাতিরূপে অবশিষ্ট আছে। ” তাছাড়া বিজয়চন্দ্র মজুমদার বলেছেন যে আসামী ভাষার বহুবচনের চিহ্ন “বিলাক ” গারো ভাষার ” পিলাক ” ( সমস্ত অর্থে ) হইতে উৎপন্ন। এছাড়াও বাংলা রাঁড় ( বিধবা, বেশ্যা ) শব্দটি যেমন মুণ্ডা রাণ্ডী শব্দের সাথে সম্পর্কযুক্ত তেমনি গারো ভাষাতেও আমরা রান্দি ( বিধবা ) শব্দটি পেয়ে থাকি। আর গারো ভাষায় তেঁতুল অর্থে যে তেন্তিলি, তেন্তালি শব্দটি ব্যবহার হতে দেখা তা বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদেও দেখা যায়। যেমন কুক্কুরীপা লিখছেন –

“দুলি দুহি পীঢ়া ধরণ ন জাই 
রুখের তেন্তলি কুমহীরে খাই।। “

এখানে স্পষ্টত যে গারো ভাষায় ব্যবহৃত তেন্তিলি, তেন্তালি শব্দটির সাথে চর্যায় ব্যবহৃত তেন্তলি শব্দের সাথে মিলে যাচ্ছে। সুতরাং বলা যায় বাংলা ভাষায় মুণ্ডার পাশাপাশি অন্যান্য যে অনার্য জনগোষ্ঠীর ভাষার প্রভাবও কিছুটা কম হলেও আছে। এছাড়া ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন – ‘ তিব্বতী-বর্মী ভাষার প্রভাব বাঙ্গালার পূর্ব অঞ্চলের উপভাষার উপর কিছু পরিমাণে দৃষ্ট হয়। ‘

পরিশেষে, বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে বলতে পারি গারোদের ভারতবর্ষে আগমন ঘটে প্রায় চার হাজার বছর বা তারও পূর্বে। তবে এটাও ঠিক যে সব তথ্য সব সময় সত্য হয়না । সুতরাং আরও সূক্ষ্ম অনুসন্ধানে হয়তো নতুন নতুন অজানা বিষয় উদঘাটিত হবে। আমি শুধু কয়েকজন নৃ-তত্ত্ববিদ, পরিব্রাজক ও ভাষাতাত্ত্বিকদের মন্তব্য এবং ইতিহাস ও সাহিত্যের বিভিন্ন সূত্র ধরে কিছু লেখার চেষ্টা করেছি। আমার এ লেখার সাথে কারও মতপার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। আশা করি ভবিষ্যতে আরও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে গারোদের উৎস অনুসন্ধান সমৃদ্ধ হয়ে ওঠবে। তবে আমাদের মনে রাখা উচিৎ জাতি পরিচয় যেটাই হোক আর কখন কোথা হতে আসিনা কেন সর্বপ্রথম আমরা মানুষ। এ নিয়ে গর্ব করা মানে মানুষ হিসেবে নিজেকে ছোট করা।

তথ্য নির্দেশঃ

১. বাঙালীর ইতিহাসঃ আদি পর্ব ( ড. নীহাররঞ্জন রায় )
২. বাংলাদেশের ইতিহাসের রূপরেখা ( ড. আশফাক হোসেন )
৩. আদিবাসী জনগোষ্ঠী ( বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি ) 
৪. বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত ( ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ) 
৫. Buddhist Mystic Songs ( Dr. Muhammad Shahidullah ) 
৫. তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান ( হুমায়ুন আজাদ ) 
৬. বাঙালিসত্তার স্বরূপ সন্ধানে ( ড. আহমদ শরীফ ) 
৭. বাঙালির মনন বৈশিষ্ট্য ( ড. আহমদ শরীফ ) 
৮. বাংলাদেশের শতবর্ষের ইতিবৃত্তান্ত ( ড. আহমদ শরীফ ) 
৯. গারো সম্প্রদায়ঃ সমাজ ও সংস্কৃতি ( ড. মাযহারুল ইসলাম তরু সম্পাদিত ) 
১০. ব্যবহারিক গারো অভিধান ( হিমেল রিছিল সম্পাদিত )
১১. চীনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ; বিদেশী ভাষা প্রকাশনালয় , পেইচিং । ১৮৮৯

COMMENTS

Wordpress (0)
Disqus (0 )
error: Content is Copywrite!